ভারী বৃষ্টিতে টানা দুই দিন চরম দুর্বিপাকে পড়তে হয়েছে রাজধানীবাসীকে। বিশেষ করে গত রবিবার দিনভর কার্যত অচল ছিল ঢাকা নগরী। বৃষ্টি কমে আসার পরও তীব্র জলাবদ্ধতা নগরজীবনকে থমকে দেয়। রাজধানীর এমন বেহাল নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রচণ্ড ক্ষোভ। নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্তরা আছেন তোপের মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থাই সংকটের মূল কারণ। বর্জ্য, পলিথিন ও দখলের কারণে ড্রেনেজ লাইনের অনেক অংশ কার্যকারিতা হারিয়েছে।
কোথাও সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পানি নির্গমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কেবল ভারী বৃষ্টি নয়, কোথাও কোথাও সামান্য বর্ষণেও ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
মাঝারি বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা। আশপাশের সড়কে কোমর সমান পানি জমে যায়। থমকে যায় ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের জীবিকার চাকা। গত রবিবার সারাদিন বন্ধ ছিল এই মার্কেট।
নিউমার্কেট সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃষ্টি হলেই এই এলাকায় যেন ছোটখাটো বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ করে পিলখানা সড়কে দেখা যায় নদীর মতো দৃশ্য। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এক যুগ ধরে তারা জলাবদ্ধতার সমস্যার মধ্যে আছেন, অথচ কর্তৃপক্ষ সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছে না।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পিলখানা ট্র্যাজেডির পর ২০০৯ সালে বিজিবির সদর দপ্তরের ভেতর দিয়ে যাওয়া দুটি ড্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তৃতীয় গেটটিও পলিথিনসহ মার্কেটের নানা আবর্জনায় প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। ফলে পানি নিষ্কাশনের কোনো পথ না থাকায় বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের এই পথ বন্ধ থাকায় নিউমার্কেটের পাশাপাশি ধানম-ি হকার্স মার্কেট, ধানমণ্ডি ২৭, আজিমপুর, লালবাগ ও পলাশীসহ আশপাশের এলাকাও এখন জলাবদ্ধতার হটস্পট।
রাজধানীর অন্য এলাকাতেও ধুঁকছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত জায়গা না পেলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ঢাকা শহরের বেশিরভাগ এলাকা কংক্রিটে ছেয়ে গেছে। নকশা অনুমোদনের সময় খোলা জায়গা রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে মানা হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নদী-খাল দখল হচ্ছে সমান তালে। তা ছাড়া বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে পানি নিষ্কাশনের পথগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
নগর ঘুরে দেখা যায়, খাল বা জলাশয় দখল বন্ধে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। কয়েকদিন আগেও দৃশ্যমান থাকা বনানী খাল এখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের স্থাপনার নিচে চাপা পড়েছে। একই প্রকল্পের জন্য হাতিরঝিলের একপাশ মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। বর্ষা এলেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কিছু হটস্পট নির্ধারণ করে দায়সারা কিছু কাজ করে। তবে এতে জনগণের কোটি টাকা খরচ আর ভোগান্তি ছাড়া আর তেমন কোনো সুফল আসে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য মাত্র সাতটি আউটলেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মালিবাগ, শান্তিনগর, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার পানি টিটিপাড়া পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে নিষ্কাশন হয়। পুরান ঢাকা, আজিমপুর, গুলিস্তান ও হাজারীবাগ এলাকার পানি ধোলাইখাল-সূত্রাপুর হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে যায়। যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, জুরাইন ও ডিএনডি এলাকার কিছু অংশের পানি শিমরাইল পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীতে পৌঁছায়। গ্রিন রোড, তল্লাবাগ ও পান্থপথ এলাকার পানি হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা পাম্প স্টেশনে যায়। আর এয়ারপোর্ট এলাকার পানি আব্দুল্লাহপুর আউটলেটে এবং শ্যামলী-মোহাম্মদপুর এলাকার পানি কল্যাণপুর এলাকা দিয়ে সরে যায়। এসব আউটলেটের মধ্যে কয়েকটি অচল। আবার কোনোটি ঠিকমতো কাজ করছে না।
বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের মোট দৈর্ঘ্য তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি। এর মধ্যে ডিএনসিসিতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার এবং ডিএসসিসি এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার ড্রেনেজ লাইন রয়েছে। ২০২০ সালের পর থেকে ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুরোদমে দেখভাল করছে দুই সিটি করপোরেশন। এর আগে দায়িত্বে ছিল ঢাকা ওয়াসা। তবে এই বিশাল নেটওয়ার্কের বড় অংশ কার্যকরভাবে সচল নয়। ড্রেনেজ লাইনের মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সচল রয়েছে, বাকি অংশ কাজ করছে না।
নিউমার্কেট-ধানমণ্ডি এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে গত সরকারের আমলে বেশ কয়েক দফা চিঠি চালাচালি করেও বিজিবি সদর দপ্তরের ড্রেনগুলো উন্মুক্ত করতে পারেনি সিটি করপোরেশন। ফলে সায়েন্স ল্যাব থেকে নিউমার্কেট হয়ে বেড়িবাঁধ আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলে (বিডিআর সেকশন ব্রিজ) নতুন আউটলেট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। প্রায় তিন মাস আগে এ নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে সংস্থাটি চিঠি দেয়। সেখানে ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে আউটলেট করতে সরকারের কাছে ৩৫০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও সাতটি আউটলেট নির্মাণ করে জলাবদ্ধতা দূর করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় ডিএসসিসি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, বকশীবাজার শিক্ষা বোর্ড হয়ে সোয়ারীঘাট; আজিমপুর কোয়ার্টার থেকে ওয়াটার ওয়ার্কস রোড হয়ে বুড়িগঙ্গা নদী; ফুলবাড়িয়া গুলিস্তান থেকে সদরঘাট; পীরজঙ্গী মাজার ও ফকিরাপুল এলাকা থেকে শাহজাহানপুর ঝিল; মগবাজার, মালিবাগ, শান্তিনগর এলাকা থেকে মালিবাগ রেলক্রসিং হয়ে শাহজাহানপুর ঝিল; বঙ্গভবন থেকে দয়াগঞ্জ বক্স কালভার্ট; সাতমসজিদ রোড থেকে ঝিগাতলা হয়ে কালুনগর খাল পর্যন্ত এসব আউটলেট নির্মাণ করা হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে ডিএসসিসি এলাকায় আর জলাবদ্ধতা হবে না বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
নগর প্রকৌশলীরা বলছেন, রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা কয়েক দশক আগে নির্মিত। তখনকার বৃষ্টিপাতের হিসাব অনুযায়ী এগুলোর নকশা করা হয়েছিল। এখন অল্প সময়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হওয়ায় পুরনো ড্রেনগুলো চাপ নিতে পারছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পানির দীর্ঘ নিষ্কাশন পথ। প্রায় পাঁচ দশক ধরে নগরীতে আউটলেট বাড়ানো হয়নি। মূলত পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বারবার ঢাকা ডুবে যাচ্ছে।
বিআইপির সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতার জন্য অব্যবস্থাপনাই মূল কারণ। প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টি হবেই। এই বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থাও থাকবে। কিন্তু ঢাকার ড্রেনেজ চ্যানেলগুলো অব্যবস্থাপনার কারণে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ না করা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই বারবার ঢাকা ডুবছে।’
তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে ড্রেনেজ ব্যবস্থা গ্রহণ করল। অথচ ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান ও যন্ত্রপাতি গ্রহণ করল না। এখন কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে তারা হাবুডুবু খাচ্ছে।’
জলাবদ্ধতা দূর করতে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং সরকার ও জনপ্রতিনিধিদেরও সচেতন হতে হবে। সচল খালগুলো রক্ষা করতে হবে। এখনো যেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব, সেগুলো উদ্ধার করতে হবে। খালের সঙ্গে ড্রেনের সংযোগ দিতে হবে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার বহুমুখী চ্যানেল তৈরি করতে হবে।’
রাজধানীতে সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতার জন্য সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার ঘাটতিকে দায়ী করছেন ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘বর্তমান জলাবদ্ধতার জন্য কোনো ব্যক্তি বা একক প্রতিষ্ঠানের দায়ী নয়, বরং পরিকল্পনার দুর্বলতাই দায়ী। গুলশান লেক ও হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সময় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) যথাযথ পরিকল্পনা না থাকায় গুলশান এলাকার বৃষ্টির পানিধারণের সক্ষমতা তৈরি হয়নি।’
ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা এড়াতে সব উন্নয়ন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, ‘বর্তমানে ডিএসসিসির বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য মাত্র তিনটি আউটলেট রয়েছে কমলাপুর-টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল। এই তিন আউটলেট দিয়ে প্রায় ১০৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশন করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এ কারণে আমরা দুটি নতুন আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছি। জলাবদ্ধতা নিরসনে আমাদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে ঢাকার জলাবদ্ধতা কমে যাবে।’