উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া নতুন সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে। গত কয়েকদিন ধরেই দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সোমবার ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানিয়েছে, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে গুলির ঘটনায় তারা ইরানের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, উপকূলীয় রাডার স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা আর ছোট ছোট অস্ত্রসজ্জিত নৌকাসহ কয়েক ডজন লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এসব হামলা হয়েছে। লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালির কাছের কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস ও ইরাক সীমান্তবর্তী খুজেস্তান প্রদেশ। এই হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে থাকা এসব যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে আঘাত হানে তেহরান। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নতুন হামলায় বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ড্রোন বহর এবং কুয়েতে হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার ধ্বংসের দাবি করেছে।
আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের মহাকাশ বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণকেন্দ্র, একটি পি-৮ বিমান রাখার হ্যাঙ্গার এবং একটি সামরিক ড্রোন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে আঘাত হেনেছে। ইরানি গণমাধ্যম আরও দাবি করেছে, কুয়েতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপরও ‘বিধ্বংসী ড্রোন’ হামলা চালানো হয়েছে। ওই ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা, বাংকার ও আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। আইআরজিসি বলছে, তাদের হামলায় কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাঘাঁটির একাধিক হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক (লাঞ্চার) ধ্বংস হয়েছে। কয়েকদিন আগে কুয়েতের আলি সালেম এবং আহমাদ আল-জাবের ঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।
এর আগে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহর প্রদেশে দুটি পানি পাম্পিং স্টেশনে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার খুজেস্তান প্রদেশের মাহশাহরে একটি সেচপাম্প স্টেশনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন এক প্রাদেশিক কর্মকর্তা। এ হামলাকে যুদ্ধাপরাধের সুস্পষ্ট উদাহরণ বলে অভিহিত করেছে ইরান। খুজেস্তান পানি ও বিদ্যুৎ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্বাস সাদরিয়ানফার বলেন, মাহশাহর ও হেন্দিজান শহরের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত হেন্দিজানের আরএমডি ড্রেনেজ পাম্পিং স্টেশনটি হামলার শিকার হয়েছে। কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ স্থাপনাটি অঞ্চলের কৃষি বর্জ্য পানি নিষ্কাশন ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা বজায় রাখতে এর কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের পানি শিল্পের মুখপাত্র ইসা বোজোরগজাদেহ বলেন, হেন্দিজানের আরএমডি ড্রেনেজ পাম্পিং স্টেশনে ভোরের হামলা ছিল মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং জীবিকার ওপর আঘাত। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন আন্তর্জাতিক সব নথি, আইন এবং প্রাচ্য ও ইরানি সংস্কৃতি-সভ্যতায় পানির একটি পবিত্র স্থান রয়েছে। পানির ওপর আগ্রাসন মানে মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর আগ্রাসন। ইরানি কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার ভোরে খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ, ওমিদিয়েহ, মাহশাহর, বেহবাহান, দেজফুল, আন্দিমেশক, আবাদান এবং শাদেগান-সংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, আহভাজ শহরের উপকণ্ঠে দুটি স্থানে হামলা হয়েছে। তবে আহভাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার খবর তারা নাকচ করেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের নতুন পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গতকাল সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ১০ ডলার বা ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৭৯ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ৯৫ ডলার বা ৪ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ৩৬ ডলারে পৌঁছায়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার প্রণালিটি দিয়ে মাত্র ছয়টি জাহাজ চলাচল করেছে, যা গত পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় গত মাসে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং আরও ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানো।