ফ্রান্স-স্পেনের নিঃশব্দ নায়করা

নীরব ঘূর্ণিঝড়

ক্রিস্টাল প্যালেসের এক তরুণ উইঙ্গারকে দেখে একদিন প্যাট্রিক ভিয়েরা বলেন, ‘ছেলেটার মধ্যে ভবিষ্যতে ব্যালন ডি’অর জেতার সব উপকরণ আছে।’ সেদিন অনেকেই কথাটাকে কোচের স্নেহের অতিরিক্ত প্রশংসা ভেবে হেসে উড়িয়ে দেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে সেই ভবিষ্যদ্বাণীর কিছুটা ঝলক উপলব্ধি করতে পারছে ফুটবলবিশ্ব। ফ্রান্সের আক্রমণভাগে কিলিয়ান এমবাপ্পে আর উসমান দেম্বেলের নাম নিয়ে যতটা হইচই, তাদের ছায়ায় থেকেও নিঃশব্দে খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন মাইকেল ওলিসে।

এবারের বিশ্বকাপে তার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানসিকতায়। আগে যাকে শুধু প্রতিভাবান তরুণ হিসেবে দেখা হতো, আজ তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, বড় মঞ্চেও তিনি সমান দাপুটে। সেমিফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে তার ভূমিকা হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্পেন সাধারণত বলদখলে রেখে প্রতিপক্ষকে শ্বাসরুদ্ধ করে রাখে, তাই ফ্রান্সের দরকার হবে দ্রুত ট্রানজিশন। আর সেই জায়গাতেই স্পেনের ফুলব্যাকদের পেছনের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করার জন্য ওলিসের মতো খেলোয়াড়ের কোনো বিকল্প নেই। সেমিফাইনালের রাতে যখন লাখো চোখ তাকিয়ে থাকবে ফ্রান্সের আক্রমণের দিকে, তখন হয়তো আবারও দেখা যাবে সেই পরিচিত দৃশ্য-ডান প্রান্তে বল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ওলিসে, সামনে একজন ডিফেন্ডার, পেছনে গ্যালারিভর্তি দর্শকের চাপ। আর পরের মুহূর্তেই তার বাঁ পায়ের এক স্পর্শ বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের ভাগ্য। তবে এবারের বিশ্বকাপে তিনি গোল করার থেকে গোলে সহায়তা করায় বেশি মনোযোগী। লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার ফ্রান্সের জার্সি বেছে নেওয়ার পর শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। খোদ কোচ দিদিয়ের দেশম স্বীকার করেন, জাতীয় দলে প্রথম দিকে তার মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হয়। কিন্তু বায়ার্ন মিউনিখে ভিনসেন্ট কোম্পানির অধীনে কাটানো একটি মৌসুম তাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। দেশমের ভাষায়, পরিশ্রম আর সমর্থনের মধ্য দিয়ে ওলিসে আজ বিশ্ব ফুটবলের সেরাদের একজন হয়ে উঠেছেন, দলের আক্রমণ আর রক্ষণের মাঝের সেতুবন্ধ তিনিই। এই বিশ্বকাপে সেসবের ঝলক দেখাচ্ছেন ওলিসে। ফিফার পাওয়ার র‌্যাংকিং অনুযায়ী, ‘ক্রিয়েটিভ’ বিভাগে টুর্নামেন্টজুড়েই শীর্ষে আছেন তিনি। সুইডেনের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এ কোনো গোল না করেও ১০-এর মধ্যে ৯.৩ রেটিং পয়েন্ট অর্জন করেন। এর আগে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে তার হাতে। এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতাদের তালিকায় শীর্ষে আছেন ওলিসে। মাঠের বাইরের প্রশংসাও কম নয়। ফক্স স্পোর্টসে থিয়েরি অঁরি বলেছেন, ‘বলছাড়া ওলিসের নড়াচড়া অতুলনীয়। এমন সৃজনশীল খেলোয়াড়রা সাধারণত রক্ষণের দায়িত্ব ভুলে যান, কিন্তু ওলিসে তা করেন না।’ ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে ফিগারো তাকে হৃদয় জয় করা এক শিল্পী হিসেবে উপাধি দিয়েছে। লে পারিজিয়াঁ রসিকতা করে লিখেছেÑ তিনি যেন আনন্দ বিতরণ করা সরকারি দায়িত্ব নিয়েছেন। ক্লাব ফুটবলেও ওলিসের পারফরম্যান্স বেশ উজ্জ্বল। এই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বায়ার্নের হয়ে ২২ গোল আর ৩১ অ্যাসিস্টে অবদান রেখেছেন তিনি, যা তাকে ইউরোপের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন উইঙ্গারদের একজন করে তুলেছে। রিয়াল মাদ্রিদ তাকে দলে টানতে মরিয়া।

শৈল্পিক স্থপতি

লা মাসিয়ার সবুজ মাঠে যে কিশোরটি একদিন বল পায়ে ঘোরাফেরা করত, তাকে দেখে কেউ ভাবেনিÑ একদিন সে ক্রোয়েশিয়া হয়ে জার্মানি ঘুরে আবার নিজের দেশেই ফিরবে। তিনিই ২০২৪ ইউরোর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করে স্পেনকে ফাইনালে তুলে যেন বার্তা দেন, দানি অলমো নামটি দেশটির বড় ম্যাচের আস্থার হয়ে উঠবে। তবে এই বিশ্বকাপে অলমোর পথটা মসৃণ নয়। গত ডিসেম্বরে লা লিগায় খেলার সময় কাঁধের চোট পেয়ে বেশ কিছু দিন মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে, যা বিশ্বকাপের আগে তার ফিটনেস আর ছন্দ নিয়ে শঙ্কায় ফেলে। ফলে টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে পারফরম্যান্সে ধার দেখা যায়নি। গোল করার থেকে নিজেকে সহায়কের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রেখেছেন। কখনো অ্যাসিস্ট, কখনো গুরুত্বপূর্ণ পাস দিয়ে দলকে এগিয়ে নিচ্ছেন অলমো। আজ ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার পায়ের দিকে চেয়ে থাকবেন স্পেনের সমর্থকরা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার একটি শট গোলরক্ষকের গায়ে লেগে ফিরে আসার পরই ফাবিয়ান রুইজ সেই বল জালে জড়ান। অর্থাৎ গোলের খাতায় নাম না উঠলেও ম্যাচের প্রথম গোলের কারিগর ছিলেন অলমোই। রদ্রি আর পেদ্রির পাশে থেকে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ প্রায় কখনোই হাতছাড়া হতে দেননি তিনি। লা মাসিয়ার ফুটবল দর্শনে বেড়ে ওঠা অলমো ছোটবেলা থেকেই বল নিয়ন্ত্রণ রাখা আয়ত্ত করেছেন। জায়গা তৈরি এবং সঠিক মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একজন শিল্পী তিনি। অলমো শুধু স্প্যানিশ পাসিং ফুটবলের প্রতিনিধি নন, বরং আধুনিক ফুটবলের একটি পূর্ণাঙ্গ অস্ত্রও। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ফুটবল মস্তিষ্ক। বেশিরভাগ খেলোয়াড় বল পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু অলমো বল পাওয়ার আগেই ভেবে রাখেন পরের তিনটি পদক্ষেপ। প্রতিপক্ষের রক্ষণের ফাঁক খুঁজে বের করা, হাফ-স্পেস ব্যবহার করা, ছোট জায়গার মধ্যেও সুযোগ তৈরি করাÑ এসবই তার বিশেষত্ব। শারীরিক গঠন শক্তপোক্ত না হলেও এটাকেই নিজের শক্তি বানিয়েছেন তিনি। নিচু হয়ে দ্রুত দিক বদলাতে পারেন। একজন ডিফেন্ডার যখন ভাবেন, তাকে আটকে ফেলেছেন, ঠিক তখনই একটি ছোট কাট বা একটি নিখুঁত পাসে পুরো পরিস্থিতি বদলে দেন অলমো। স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে সম্প্রতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মধ্যমাঠ ঘিরেই সবচেয়ে বেশি আস্থা তার। তার ভাষায়, রদ্রি-পেদ্রি-অলমোর মতো খেলোয়াড় থাকা মানেই যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জেতার সাহস রাখা যায়। তবে অলমোকে ঘিরে শঙ্কাও আছে। শারীরিকভাবে শক্তিশালী ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে কখনো কখনো তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। যদিও তার সবচেয়ে বড় গুণ, তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা জানেন এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তা কাটিয়েও উঠতে পারেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে অলমোর ভূমিকা হতে পারে স্পেনের ভাগ্য নির্ধারণকারী। অলমো জানেন, বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়দের জন্যই বড় মুহূর্ত অপেক্ষা করে।