ঝুঁকিতে রাষ্ট্রীয় ৪৯ কোম্পানি

বছরের পর বছর ধরে উচ্চ ঋণের দায়ভারের কারণে রাষ্ট্রীয় ১৯ কোম্পানিকে ‘অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ৩০টি কোম্পানিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ৪৯ কোম্পানির নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বর্তমান সরকার ৫ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার পুঞ্জীভূত দায় খুঁজে পেয়েছে। ওই সব কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় উন্নতির মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তার উদ্দেশ্যে ফিবছর সরকার বাজেট থেকে বরাদ্দ দিলেও আর্থিক অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বরং বছরের পর বছর লোকসান গুনে আবারও সরকারের কাঁধে দায় চেপেছে।

গত ৩০ জুন প্রকাশিত অর্থ বিভাগের ওই বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১৯ রাষ্ট্রীয় কোম্পানির সম্মিলিত আর্থিক দায়ের পরিমাণ ২ লাখ ২২ হাজার ৩৮১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৩০ কোম্পানির সম্মিলিত দায় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬৩০ কোটি ৭১ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে মোট ১২২ রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বা স্টেট-ওউন-এন্টারপ্রাইজ (এসওই) এবং অটোনোমাস বডি (এবি) বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আর্থিক চিত্র তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ৫০টি কোম্পানির আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো, নিয়মিত নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন হয় এবং ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার কথা বলা হয়েছে। অবশিষ্ট ২৩টির মধ্যে পাঁচটি খুব ভালো করছে এবং ১৮টির আর্থিক বিবরণীতে কোনো ঝুঁকি পাওয়া যায়নি।

অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসওই ও এবিসমূহ কর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক বিচারে গুরুত্বপূর্ণ । কিন্তু লোকসানে থাকার কারণে সেই ভূমিকা পালনে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। আর্থিক ভিত দুর্বল হয়ে এসব কোম্পানি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছে। পরিচালন ব্যয়ের জন্যও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ধরনা দেয় সরকারের কাছে। বাংলাদেশের এসওইগুলো নিয়ে মাথাব্যথার শুরু ৯০-এর দশক থেকে। বিশেষ করে তৎকালীন সরকারপ্রধান জেনারেল এরশাদের দীর্ঘ শাসনামলে এসব প্রতিষ্ঠানের গভর্ন্যান্স বা সুশাসনে চিড় ধরে। তারপর থেকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় সরকারের অনেক কোম্পানি। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এসওই নিয়ে একাধিক একক ও যৌথ গবেষণা করে সরকারকে এসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণে পরামর্শ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বরং রাষ্ট্রীয় কোনো কোম্পানি বিক্রির নামে স্বল্পমূল্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে চলে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন শত শত কর্মী। রাষ্টের মূল্যবান সম্পদ হস্তান্তরের মাধ্যমে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতিসাধনও করা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারত্বের ঘাটতি, ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহিতার অভাব, অদক্ষ পরিচালনা ও কম উৎপাদনশীলতা, অতিরিক্ত জনবল, পুরনো প্রযুক্তি, দুর্বল অপারেশনাল দক্ষতা, উচ্চ পরিচালন ব্যয়, অস্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, সম্পদের অপব্যবহার ও দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের কারণে অনেক এসওই আর্থিক সক্ষমতা হারিয়েছে।

নিজেদের গবেষণায় বাণিজ্যিক ও সামাজিক লক্ষ্য একসঙ্গে বহন করায় অনেক এসওই তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা হারিয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও বিশ্বব্যাংক জানায়, অনেক রাষ্ট্রীয় কোম্পানির উদ্দেশ্য শুধু লাভ করা নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক উন্নয়ন বা স্বল্পমূল্যে জনসেবা দেওয়াও মূল উদ্দেশ্য। ফলে শুধু লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন সবসময় যথাযথ নয়। কিন্তু এসব খাতে মূল্যনিয়ন্ত্রণ, অদক্ষতা এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, পাটশিল্প, চিনিশিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, রেলওয়ে এবং কৃষি ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক।

বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করতে গিয়ে বলেছেন, লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে। এমন প্রেক্ষাপটে বেসরকারীকরণ সম্পর্কিত নীতিমালা তৈরিতে কাজ করছে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সেল। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রের কিছু প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবা দিয়ে থাকে। সেসব প্রতিষ্ঠানের লোকসান সাধারণত সাবসিডি বা ভর্তুকি হিসেবে গণ্য করা হয়। তারপরও ওই সব প্রতিষ্ঠানের লিকেজ বা ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা, অপচয় কমানো এবং পরিচালন ব্যয় হ্রাসে দক্ষতার উন্নতি ঘটানোর মাধ্যমে আর্থিক দায়ভার আরও কমানো যেতে পারে। সরকারকে এই বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারের হাতেই থাকতে হবে। তবে লোকসানি কোম্পানি থাকার প্রয়োজন নেই। এগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একটি নীতিমালা করা যেতে পারে। সে লক্ষ্যে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা জরুরি। ওই কমিশন বেসরকারীকরণের একাধিক মডেল নিয়ে স্টাডি করে এক বা দুটি মডেল সরকারকে সুপারিশ করতে পারে। যেমন একটি এমন হতে পারে যে, সরকার মালিকানা রেখে ব্যবস্থাপনা ব্যক্তি খাতে ছাড়তে পারে; আবার এমনও হতে পারে পুরোটাই ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দিতে পারে। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মতো জরুরি প্রয়োজনে সরকার হস্তক্ষেপ করবে। মোদ্দাকথা, বড় ধরনের সংস্কার দরকার এসওই’র ক্ষেত্রে। সে সময় চলে এসছে। আইন-কানুন মানতে হবে। এর সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে ভালো ফলাফল আসতে বাধ্য। একটা কথা জোর দিয়ে বলতে চাই, বছরের পর বছর এসব কোম্পানির ক্রমবর্ধিত ঋণের দায়ভার নেওয়ার কোনো মানে হয় না।    

অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনটি ২০২৩-২৪ অর্থবছর সমাপনীতে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত। ওই প্রতিবেদন অনুসারে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার পুঞ্জীভূত দায় সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের। আর্থিক দায়ে এরপরে ধারাবাহিকভাবে শীর্ষস্থানে অবস্থান যথাক্রমে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) ৬৭ হাজার ৭৪৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা; পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ৫৬ হাজার ৩৮৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা; বিসিআইসি ৩০ হাজার ৮৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা; বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ৪১ হাজার ২৮৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা; ঢাকা ওয়াসা ২৬ হাজার ৯২৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা; তিতাস গ্যাস ২৫ হাজার ৩৬০ কোটি ৩০ লাখ টাকা; ডিপিডিসি ১৭ হাজার ৯৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা; বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন ১৬ হাজার ৫৭৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা; বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা; গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) ১৪ হাজার ১৩১ কোটি ১৯ লাখ টাকা; আশুগঞ্জ পাওয়ার ১২ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা; ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি (ইজিসিবি) ১০ হাজার ১৩৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা; যমুনা অয়েল কোম্পানি ৭ হাজার ৯৭১ কোটি ৭১ লাখ টাকা; জালালাবাদ গ্যাস কোম্পানি ৬ হাজার ৮৭৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা; শাহজালাল সার কারখানা ৬ হাজার ২৭৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা; টেলিটক ৫ হাজার ৫৫৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা; টিসিবি ৪ হাজার ৩৩৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা; ওয়েস্ট জোন পওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৪ হাজার ২৫১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা; বিআরটিসি ২ হাজার ৯৭৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা; খুলনা ওয়াসা ২ হাজার ৮৬৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং বি-আর পওয়ারজেন লি. ২ হাজার ৫৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এই ২২টি কোম্পানির বাইরে থাকা আরও ২৭টি কোম্পানির আর্থিক দায় রয়েছে ১০০ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত।     

প্রতিবেদনটিতে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সর্বশেষ আর্থিক রিপোর্ট সংযোজন করা হয়নি। ইতিমধ্যে প্রতিটি কোম্পানির আর্থিক চিত্র আরও পরিবর্তন হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ায় সর্বশেষ দুই অর্থবছরের তথ্য সংযোজন করা সম্ভব হয়নি।