লাতিন শিল্প নাকি ব্রিটিশ চাতুর্য

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:১২ এএম

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও তপ্ত দ্বৈরথ এবার রূপ নিতে যাচ্ছে এক নতুন মঞ্চে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আটলান্টার মাঠে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম দল দুটি ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সেমিফাইনালের মঞ্চে লড়বে। একদিকে ১৯৬৬ সালের স্যার আলফ রামসের সেই ‘পশু’ সম্বোধনের ক্ষোভ, ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘ঈশ্বরের হাত’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ এবং ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ডের রোমাঞ্চকর ইতিহাস অন্যদিকে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের রাজনৈতিক ক্ষত। সব মিলিয়ে এই ম্যাচকে ঘিরে মাঠের বাইরে পারদ চড়ছে তুঙ্গে।

মাঠের আবহ শান্ত করতে আর্জেন্টিনার ‘২ এপ্রিল যুদ্ধ ভেটেরান ফেডারেশন’ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘এটি কোনো সশস্ত্র প্রতিশোধ কিংবা ঐতিহাসিক ক্ষতিপূরণ নয়। ফুটবলীয় আবেগ আর জাতীয় চেতনাকে আলাদা রাখুন।’ আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডও ম্যাচটিকে ‘কেবলই একটি ফুটবল ম্যাচ’ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু ড্রেসিংরুমে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের ‘মালভিনাসের স্মৃতি’ নিয়ে গাওয়া গান আর সমর্থকদের উন্মাদনা বলছে, লড়াইটা শুধুই ফুটবলের গণ্ডিতে আটকে নেই।

ইতিহাসের সেই রোমান্টিক আবেগকে পাশে সরিয়ে রাখলে, মাঠের কৌশল ও শারীরিক সক্ষমতার বিচারে ম্যাচটিতে রয়েছে দারুণ এক দ্বৈরথের আভাস। টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড যখন প্রিমিয়ার লিগের চিরচেনা গতি ও পাওয়ার-ফুটবল খেলছে, সেখানে আর্জেন্টিনা খেলছে তাদের নিজস্ব ছন্দে। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার গড় গতি সবচেয়ে কম (৪৮ দলের মধ্যে ৪৮তম)। ৩৯ ছুঁইছুঁই লিওনেল মেসি এখন মাঠে খুব বেশি দৌড়ান না, যার প্রভাব পড়েছে দলের সামগ্রিক গতিতে। তবে গতি কম হলেও লিওনেল স্কালোনির এই অভিজ্ঞ দলটির রয়েছে অবিশ্বাস্য ট্যাকটিক্যাল মারণাস্ত্র এবং ম্যাচ ধরে রাখার মানসিকতা। শেষ তিনটি নকআউট ম্যাচেই (মিসর, কেপ ভার্দে এবং সুইজারল্যান্ড) তারা অতিরিক্ত সময়ে বা শেষ মুহূর্তের গোলে জয় ছিনিয়ে এনেছে।

অন্যদিকে টুখেলের ইংল্যান্ড দলের মূল শক্তি তাদের মিডফিল্ডের ক্ষিপ্রতা। ডেক্লান রাইসের শক্তি এবং জুড বেলিংহ্যামের বক্স-টু-বক্স রানিং আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে বেলিংহ্যাম যখন মাঝমাঠ থেকে স্প্রিন্ট টেনে ওপরে ওঠেন, তখন আর্জেন্টিনার ধীরগতির সেন্টার-ব্যাকরা সমস্যায় পড়তে পারেন। তবে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ এবং ম্যাক অ্যালিস্টার পাসের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে ওস্তাদ। তারা খেলার গতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ইংল্যান্ডের প্রেসকে অকার্যকর করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। স্কালোনি ভালো করেই জানেন যে ইংল্যান্ডের গতির সঙ্গে দৌড়ে জেতা অসম্ভব, তাই আর্জেন্টিনা চাইবে বল পজেশন ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে।

টুখেলের গেমপ্ল্যানে উইঙ্গারদের ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট তারা মাঠের দুই প্রান্ত ব্যবহার করে আক্রমণ ছড়াতে ভালোবাসেন। বুকায়ো সাকা যদি ডান প্রান্তে সম্পূর্ণ ফিট হয়ে নামেন, তবে আর্জেন্টিনার লেফট-ব্যাক নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের বাড়তি চাপ তৈরি হবে। সুইজারল্যান্ড যেভাবে দুই প্রান্ত দিয়ে ক্রস বাড়িয়ে আর্জেন্টিনাকে কোণঠাসা করেছিল, ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন সেই সুযোগেরই অপেক্ষায় থাকবেন। তবে স্কালোনিও তার ডিফেন্সকে জমাট রাখতে রদ্রিগো দে পলকে উইংয়ের দিকে কিছুটা বাড়তি নজর দেওয়ার দায়িত্ব দিতে পারেন।

দুই দলই ১২০ মিনিটের ক্লান্তিকর ম্যাচ খেলে সেমিফাইনালে এসেছে। এই অবস্থায় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে দুই কোচের সাইড বেঞ্চ বা বিকল্প খেলোয়াড়দের ভূমিকা হবে দেখার মতো। আর্জেন্টিনার দলে হুলিয়ান আলভারেহ বা লাউতারো মার্তিনেজের মতো তারকারা আছেন, যারা ম্যাচের যেকোনো মুহূর্তে এসে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর এবারই সবচেয়ে বয়স্ক দল নিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে লড়ছে আর্জেন্টিনা। এই অতি-অভিজ্ঞতা তাদের বড় ম্যাচে স্নায়ু ধরে রাখতে সাহায্য করে, যা সুইজারল্যান্ড বা মিসরের বিপক্ষে স্পষ্ট দেখা গেছে। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের তরুণ বেঞ্চের গতি ম্যাচের শেষভাগে আর্জেন্টিনার ক্লান্ত রক্ষণের ওপর চড়াও হতে পারে।

কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা হেড থেকে কোনো গোল না পেলেও, এই অভিজ্ঞ দলটি এবারের বিশ্বকাপে ইতিমধ্যে ৩টি হেডার গোল করেছে। ফলে সেট-পিস ও শূন্যের লড়াইয়ে জন স্টোন্সদের কড়া পরীক্ষা দিতে হবে।

মাঠের ভেতর আর্জেন্টিনা হয়তো কম দৌড়াচ্ছে, কিন্তু তাদের ট্যাকটিক্যাল পরিপক্বতা এবং মানসিক দৃঢ়তা যেকোনো তরুণ দলের জন্য ভয়ের। অন্যদিকে ৬০ বছরের ট্রফি খরা কাটানোর তাড়নায় ফুটছে ইংল্যান্ড। আটলান্টায় বুধবারের ম্যাচটি তাই কেবল ফুটবলের ৯০ বা ১২০ মিনিটের লড়াই নয়; এটি গতির বিরুদ্ধে অভিজ্ঞতার, এবং ব্রিটিশ তীব্রতার বিরুদ্ধে লাতিন শৈল্পিক চাতুর্যের এক চরম পরীক্ষা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত