নির্বাচন কমিশন আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০২৬ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভিন্নধর্মী নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালায় কিছু সংশোধনী প্রস্তাবও উত্থাপন করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকবে না। পাশাপাশি পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, ইভিএম বাতিল, নির্বাচনী জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা বাড়ানোর মতো পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথাও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। কিন্তু ব্যালট পেপার থেকে কোনো প্রতীক সরিয়ে দিলেই কি রাজনীতির প্রভাবও মুছে যাবে? বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত দলীয় প্রতীকে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফলে স্থানীয় সরকারের অন্যতম দায়িত্ব স্থানীয় উন্নয়ন, নাগরিকসেবা ও স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য ও দলীয় অবস্থান বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ফলে স্থানীয় নির্বাচন ক্রমেই জাতীয় রাজনীতির সম্প্রসারিত সংস্করণে পরিণত হয়।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন এই রীতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ব্যালট পেপার বদলানো যতটা সহজ, মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো ততটা সহজ নয়। দলীয় প্রভাব, অর্থের দাপট এবং স্থানীয় পেশিশক্তির উপস্থিতি একদিনে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার নয়। ফলে ‘প্রতীকহীন নির্বাচন মানেই প্রভাবহীন নির্বাচন’ এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থানীয় গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এশিয়ার অন্যতম সফল বিকেন্দ্রীকরণ মডেল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে কেরালায় স্থানীয় সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বাস্তবায়নে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু একই দেশের উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের মতো রাজ্যে স্থানীয় নির্বাচন এখনো অনেক ক্ষেত্রে জাতপাত, প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট শুধু আইন পরিবর্তন করলেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না; রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। একই ধরনের অভিজ্ঞতা এশিয়ার অন্যান্য দেশেও দেখা যায়। কিছু দেশ স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে সফল স্থানীয় সরকার মডেল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
এশিয়ার দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী উদাহরণ। সেখানে স্থানীয় সরকারগুলো কার্যকর ও বাস্তব ক্ষমতা ভোগ করে। তারা নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহ, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সফলতার জন্য শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনী পদ্ধতি নয়, বরং নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে প্রকৃত ক্ষমতা কতটা রয়েছে, সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই নির্বাচন নিয়ে কথা বলি, কিন্তু নির্বাচনের পর নির্বাচিত ব্যক্তির হাতে কতটুকু প্রকৃত ক্ষমতা থাকে, সেই প্রশ্ন খুব কমই তুলি। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সম্ভবত এখানেই। একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র কিংবা জেলা পরিষদের প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাকে প্রায়ই কেন্দ্রীয় বরাদ্দের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজস্ব রাজস্ব আয়ের সুযোগ সীমিত, পরিকল্পনা গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত, এমনকি প্রশাসনিক ক্ষমতার ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে প্রশ্নটি কেবল প্রতীকের নয়, ক্ষমতারও।
দলীয় প্রতীক না থাকলেও দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য, অর্থের প্রভাব এবং স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতেই পারে। তাই নির্দলীয় নির্বাচনকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করাই বেশি জরুরি। নির্বাচনকে অর্থবহ করতে হলে স্থানীয় সরকারকে আর্থিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে হবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিজস্ব বাজেট প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণের সুযোগ বাড়াতে হবে। নির্বাচনী জামানতের পরিমাণ ও ব্যয়ের সীমা বৃদ্ধির যে সিদ্ধান্ত কমিশন নিয়েছে, সেই অর্থের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রার্থীদের সম্পদ, আয় এবং নির্বাচনী ব্যয়ের তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিক পর্যবেক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। শুধু ভোটের দিন নয়, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াজুড়ে নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের মানুষ গত ১৫ বছরে রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। তাই শুধু নতুন বিধিমালা বা নতুন নিয়ম দেখেই তারা আশ^স্ত হবে বলে মনে হয় না। স্থানীয় গণতন্ত্রের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে কার্যকর ক্ষমতা আছে কিনা, তিনি জনগণের কাছে কতটা জবাবদিহিমূলক এবং স্থানীয় জনগণের মতামত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে তার ওপর। পৃথিবীর বহু গণতান্ত্রিক দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, একটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ শুধু ভোটের দিন দিয়ে বিচার করা যায় না। ভোটের পরের দিন থেকেই শুরু হওয়া শাসনব্যবস্থাই গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রতীকের নয়, ক্ষমতার; নিয়মের নয়, বাস্তবায়নের; নির্বাচনের নয়, নির্বাচনের পরের শাসনব্যবস্থার। কারণ ভোটের দিন গণতন্ত্রের সূচনা হতে পারে, কিন্তু তার সাফল্যের বিচার হয় ভোটের পর প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি জবাবদিহিতায় এবং প্রতিটি স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য কেবল আরেকটি নির্বাচন নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও।
লেখক : শিক্ষক ও স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক
nazmunquadery@gmail.com