বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে)। গত এক দশক প্রযুক্তির এই খাত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, যেখানে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, বিশ্বব্যাপী উৎপাদন, সরবরাহ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনার বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে। এই খাতের ক্ষতিকর দিক বা ঝুঁকির বিষয় নিয়ে আলোচনা সেভাবে হয়নি। সম্প্রতি পর্তুগালে বিশ্বের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, মুদ্রাবাজার বিশেষজ্ঞ এবং আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা সমবেত হয়েছিলেন ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য আয়োজিত সিম্পোজিয়ামে। সেখানে উপস্থিত অনেক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকার এআইয়ের এমন বেপরোয়া অগ্রগতি এবং বিশ্বঅর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই অনুষ্ঠানে একটি বিষয় প্রথমবারের মতো বেশ গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়েছে, তা হচ্ছে এআই কি আসলে বিশ্বঅর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনা, নাকি বড় ধরনের হুমকি হয়ে দেখা দেবে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয়োজিত সিম্পোজিয়ামে এআই নিয়ে উদ্বেগের বেশ কিছু কারণও উঠে এসেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্চে এআই-কেন্দ্রিক মাত্রাতিরিক্ত ঋণ এবং বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ার বিষয়।
এআই-ভিত্তিক ঋণের পরিমাণ ক্রমেই মারাত্মক আকার ধারণ করে চলেছে। এই প্রযুক্তির সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই ঋণ নিয়ে এই খাতে কাজ করছে। যারা এআই প্রযুক্তি তৈরি করছে, তারা ঋণ নিয়েই সেটা করছে। আবার এআই প্রযুক্তির জন্য যারা অবকাঠামো নির্মাণ করছে, যেমন ডাটা সেন্টার, তারা ঋণ নিয়েই সেটা করছে। যারা এআই প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে, তারাও ঋণ নিয়েই সেগুলো করছে। এমনকি যারা এআই খাতে বিনিয়োগ করছে বা বিভিন্ন এআই কোম্পানির শেয়ার কিনছে, তারাও ঋণ নিয়েই সেটা করছে। ফলে এআই-কেন্দ্রিক ঋণের পরিমাণ ভয়ংকর আকার ধারণ করতে চলেছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন ডাটা সেন্টার নির্মাণের জন্য কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে প্রয়োজন হবে বলে জানা গেছে। এমনকি ভারতে এআই-কেন্দ্রিক ডাটা সেন্টার নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের জন্য আমেরিকার বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি চুক্তি সম্পাদন করেছে। এসব বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ সম্পন্ন হবে ঋণ নিয়ে। অতীতে অর্থনীতির অন্য কোনো খাত এত বেশি ঋণনির্ভর ছিল কিনা, তা আমাদের জানা নেই। এই সিম্পোজিয়ামে উপস্থিত ছিলেন আইএমএফের (ইন্টারন্যাশনাল মানিটরি ফান্ড) মানিটরি এবং ক্যাপিটাল মার্কেট বিভাগের পরিচালক, টোবিয়াস এডরিয়ান। তিনি এআই খাতে মাত্রাতিরিক্ত ঋণের ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়ে উল্লেখ করেছেন যে এআই খাতে বিনিয়োগের উভয় পক্ষের এভাবে ব্যাপক ঋণনির্ভর হয়ে যাওয়া বিশ্বঅর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য বেশ উদ্বেগজনক।
এআইয়ের দ্রুত প্রসারের ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়ে সিম্পোজিয়ামে উপস্থিত অনেক নীতিনির্ধারক, ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদ এই মর্মে সর্তক করেছেন যে এআই বুমের কারণে যদি এখানে কখনো ধস নামে, তাহলে বিশ্বঅর্থনীতিতে ভয়াবহ মন্দা নেমে আসতে পারে। তাদের অনেকের মতে ডিজিটাল প্রযুক্তির এই পর্যায়ে অতিমাত্রার বিনিয়োগ এবং নির্ভরশীলতা দীর্ঘ মেয়াদে কখনই ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট থেকে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছে যে এআই খাতে অতিবিনিয়োগের ঝুঁকি যদি উল্টো কাজ করে, তাহলে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা অনিবার্য। অনেক অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকার অবশ্য বরাবরের মতো এআই নিয়ে অপার সম্ভাবনার কথাই শুনিয়েছেন। এ ব্যাপারে আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ফেডারেল রিজার্ভের সদ্য দায়িত্ব নেওয়া চেয়ারম্যান, কেভিন ওয়ার্স সবচেয়ে শক্ত কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে আমরা এই প্রযুক্তি বিপ্লবের প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপে চলে এসেছি এবং এখান থেকে আমরা প্রচুর সম্ভাবনা সামনে দেখছি। এই প্রসঙ্গে কেভিন ওয়ার্স আরও উল্লেখ করেন, ‘আপনারা যদি আমাকে এআইয়ের ব্যাপারে নিরাশ করেন এবং আমাকে হতাশার কথা শোনান, তাহলে আমি সেটা মানতে রাজি না।’
আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এআই নিয়ে এমন আশাবাদী হবেন এটাই স্বাভাবিক। কেননা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আমেরিকা হচ্ছে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া দেশ। ডিজিটাল যুগের সূত্রপাত এবং বিস্তার ঘটেছে আমেরিকায় এবং আমেরিকার অর্থনীতিও এই খাত থেকে বেশি সুবিধা পেয়েছে। বিগত দুই দশক আমেরিকার অর্থনীতি চাঙ্গা করে রেখেছে এই প্রযুক্তি খাত। বিগত দেড় যুগ একটি কথা বহুল প্রচলিত ছিল যে আমেরিকার অর্থনীতি চালিয়েছে ফাংগ, অর্থাৎ বৃহৎ পাঁচটি প্রযুক্তি কোম্পানি, যথা ফেসবুক, আমাজান, অ্যাপল, নেটফ্লিক্স এবং গুগল। কিন্তু গত কয়েক বছর এই কোম্পানিগুলোর পারফরমেন্স কিছুটা নিম্নগামী। এ কারণেই আগামী বেশ কয়েক বছর আমেরিকার অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার জন্য প্রযুক্তির নতুন কোনো খাতের প্রয়োজন ছিল এবং এআই হয়েছে সেই কাক্সিক্ষত খাত। এআই নিয়ে আমেরিকা তো বটেই, সারা বিশ্বে যে মাত্রার উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে এবং যে বিশাল বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরি করা হয়েছে, তাতে এই একটি মাত্র খাতের ওপর নির্ভর করে আমেরিকার অর্থনীতি আগামী দেড় থেকে দুই যুগ চাঙ্গা থাকতে পারবে। এ রকম সুযোগের পক্ষে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জোরালো বক্তব্য দেবেন এটাই স্বাভাবিক এবং এই সিম্পোজিয়ামে তিনি করেছেনও তাই।
ব্যাংক অব কানাডার গভর্নর, টিফ ম্যাকলেম অবশ্য সতর্কতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি এআই-ভিত্তিক কোম্পানির শেয়ারের অতিমূল্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখলেও, প্রযুক্তির এই খাতের ব্যাপক সম্ভাবনাই দেখেছেন। এই প্রসঙ্গে ইন্টারনেটের যুগান্তকারী সফলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয় তিনি বলেন যে আজ এআই নিয়ে যেমন উদ্বেগ ও শঙ্কার কথা অনেকে বলছেন, ঠিক তেমনি শুরুর দিকে ইন্টারনেটের অগ্রযাত্রার ব্যাপারে অনেকে এ-রকমই বলেছিলেন। কিন্তু আজকের দিনের বাস্তবতা হচ্ছে যে ইন্টারনেট আমাদের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত করেছে। ইন্টারনেটের জয়জয়কার অবস্থা এবং বিগডাটা বিশ্লেষণ সত্ত্বেও, এই শতাব্দীর শুরুর দিকে ডটকম বাবল এবং ২০০৮ সালে সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারির কারণে সৃষ্ট বিশ্বমন্দা এড়ানো সম্ভব হয়নি।এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ঝুঁকি নিয়ে অ্যাপল গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ, টরসটেন সøক খুবই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তার মতে এআইয়ের ব্যবহার যেভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগগুলো নিয়ে নিচ্ছে, তাতে নতুন করে মানুষের চাকরির সুযোগ একেবারেই সীমিত হয়ে যাবে এবং অসংখ্য মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। ফলে বেকারত্বের হার মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাবে। কর্মক্ষেত্রে এ-রকম নেতিবাচক প্রভাবের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ব্যাপকহারে হ্রাস পাবে, যার প্রভাব পড়বে সার্বিকভাবে অর্থনীতির ওপর। এআই ব্যবহার করে যতই মানসম্পন্ন পণ্য ও সেবা উৎপাদন করা হোক না কেন সেগুলো ক্রয় করার মতো অর্থ মানুষের হাতে থাকবে না। প্রচুর সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আজ যে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ হচ্ছে এআই খাতে, ভবিষ্যতে তো সেই পরিমাণ রিটার্ন নাও পাওয়া যেতে পারে। এ রকম ঘটলে এআই খাতে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বিগত কয়েক বছর এআই প্রযুক্তির ব্যাপক সম্ভাবনার কথা শোনা গেলেও, এখন এই খাতের ঝুঁকির বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনা যে একেবারে ভিত্তিহীন তেমন নয়। কেননা এই খাত নিয়ে ইতিমধ্যে কিছু নেতিবাচক ঘটনা অনেকের দৃষ্টিতে এসেছে। এআইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের অতিমূল্যের কারণে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে যে এআই বাবল কি স্টক মার্কেট ক্রাশের কারণ হয়ে দেখা দেবে। তাছাড়া আমেরিকার প্রাইভেট ক্রেডিট কোম্পানিগুলো এআইয়ের কারণে এক ধরনের সমস্যায় পড়ে যায়। কেননা আমেরিকার প্রাইভেট ক্রেডিট কোম্পানিগুলো ব্যাপক হারে ঋণদান করেছে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিতে। এআই ব্যবহার শুরু হওয়ায়, সেসব প্রযুক্তি কোম্পানির প্রোডাক্ট বা অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে। ফলে এসব প্রযুক্তি কোম্পানির উপার্জন কমে যাবে বিধায় তারা প্রাইভেট ক্রেডিট কোম্পানি থেকে গৃহীত ঋণের টাকা পরিশোধ করতে সমস্যায় পড়বে। এই আশঙ্কা থেকে যেসব ধনাঢ্য ব্যক্তি প্রাইভেট ক্রেডিট কোম্পানিতে অর্থ জমা রেখেছিলেন, তাদের অধিকাংশ সেই অর্থ সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। অবস্থা প্রায় ২০০৮ সালের সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারির পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। প্রাইভেট ক্রেডিট কোম্পানি যেহেতু জনগণের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করে না, তাই নানা রকম কৌশল অবলম্বন করে এই বিপর্যয় কাটানো গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এবং বিশ্বের উৎপাদন, সরবরাহ ও সেবার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী সফলতার স্বপ্ন দেখিয়ে এআই প্রযুক্তি যে যাত্রা শুরু করেছিল, সেটি একটি পরিণত অবস্থায় পৌঁছার আগেই নানা রকম জটিলতা, সংশয় ও শঙ্কার মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। এই শঙ্কার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটেছে সম্প্রতি পর্তুগালে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিম্পোজিয়ামে। বিশ্বের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে এআই প্রযুক্তি কি ধীরে চলার নীতি অনুসরণ করবে, নাকি এসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা উপেক্ষা করে এআই তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং বিশেষজ্ঞ ও আর্থিক খাত বিশ্লেষক। টরন্টো, কানাডা
Nironjankumar_roy@yahoo. Com