বিখ্যাত কোচ হোসে মরিনহো একবার বলেছিলেন, ‘ফুটবল হলো এমন এক মঞ্চ, যেখানে প্রতিটি খেলোয়াড় নিজের গল্পের নায়ক।’ তবে গল্পের নায়কদের আড়ালে সবসময় একটি অলিখিত যুদ্ধের প্রহর গুনতে থাকে একটি লুকানো রেস, যেখানে কেউ কারোর চেয়ে এক চুল কম নয়। যারা থাকে দুই মেরুতে, কিন্তু লক্ষ্য একটাই। ডালাসের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ড যখন মুখোমুখি হবে, তখন মাঠের এই লুকানো রেসের পর্বের আলোতে থাকবেন হ্যারি কেইন ও ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। একদিকে গোলমেশিন কেইনের পায়ের জাদুতে গোল উৎসবের পরিকল্পনা, অন্যদিকে আধুনিক ফুটবলের ধারা বদলে দেওয়া রোমেরোর অদম্য রক্ষণভাগ।
আধুনিক ফুটবলের অনেক ডিফেন্ডার যেখানে কেবল নিজেদের গোল এরিয়া পাহারা দেন, সেখানে রোমেরো যেন একজন শিকারি, যিনি সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষের অর্ধে ছুটে যান। তার এই অদম্য মানসিকতা বা ‘ম্যাভেরিক’ স্বভাব দলকে যেমন সাহস জোগায়, তেমনি বিপক্ষ দলের আক্রমণভাগের জন্য তৈরি করে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। এই দুজনই যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ। একজন গোল করার নেশায় মত্ত, অন্যজন গোল আটকানোর নেশায় আসক্ত। এই লুকানো রেসে কে কাকে টেক্কা দেবে, সেই স্নায়ুর লড়াই এখন বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
হ্যারি কেইন। নামটাই যথেষ্ট প্রতিপক্ষের রক্ষণে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য। বায়ার্ন মিউনিখের জার্সি গায়ে হোক কিংবা ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে, কেইন মানেই যেন গোলগ্যারান্টি। এবারের বিশ্বকাপে ৬ ম্যাচে ৬ গোল করে তিনি টুর্নামেন্টের অন্যতম গোলমেশিন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কেইনকে নিয়ে কোচ টমাস টুখেল যে ‘শার্ক’ বা হাঙরের উপমা দিয়েছিলেন, তা তার খেলার ধরনের সঙ্গে একদম মিলে যায়। তিনি যখনই মাঠের কোনো কোনায় গোল করার সামান্যতম ঘ্রাণ পান, তখন বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য তাকে আটকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেইনের খেলার গভীরতা কেবল গোল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি যখন নিচে নেমে আসেন, তখন প্লে-মেকারের ভূমিকাতেও তাকে দুর্দান্ত লাগে। তবে তার মূল অস্ত্র হলো তার ‘এয়ারিয়াল ডমিন্যান্স’ বা হেড করার ক্ষমতা। বাতাসের মধ্যে অনেকটা সময় ভেসে থেকে নিখুঁত টাইমিংয়ে বল জালে জড়ানোর মতো দক্ষতা বিশ্ব ফুটবলে খুব কম খেলোয়াড়েরই আছে। কেইনের হেডারগুলো যেন এক একটি লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র, যা গোলরক্ষককে নড়ার সুযোগও দেয় না।
এই ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করার দায়িত্ব থাকবে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের ‘কুটি’ খ্যাত ডিফেন্ডারের ওপর। আর্জেন্টিনা দলে তার গুরুত্ব ঠিক কতটা, তা লিওনেল মেসির একটি মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়। মেসি তাকে বিশ্বের সেরা সেন্ট্রাল ব্যাক অভিহিত করে বলেছিলেন, ‘আমার পেছনে তাকে (রোমেরো) পাওয়াটা আমার জন্য সবচেয়ে ভালো কিছু। সে সবসময় আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে, কারণ সে তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে ওয়ান-অন-ওয়ান খেলতে ভালোবাসে।’ শুধু মেসি নন, সতীর্থ রদ্রিগো ডি পলও একই সুর মিলিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার সামনে কুটিকে পাওয়াটা আমার ক্যারিয়ারের সেরা প্রাপ্তিগুলোর একটি। সে আমাকে আক্রমণভাগে উঠে যেতে সাহস জোগায়।’
কেন রোমেরো এত ভয়ংকর? তার উত্তর লুকিয়ে আছে তার খেলার ধরন ও সহজাত প্রবৃত্তিতেই। রোমেরোর হেডিং দক্ষতা সাধারণ ডিফেন্ডারদের চেয়ে আলাদা। তার হেডের আসল রহস্য হলো তার শারীরিক ভারসাম্য এবং বিপক্ষ খেলোয়াড়কে পড়ার ক্ষমতা। তিনি যেন সহজেই পড়ে ফেলেন, স্ট্রাইকার কোন দিকে মাথা ঘোরাবেন বা কোন কোনায় বল রাখতে চাইবেন। কেইন যেখানে নিখুঁত টেকনিকের ওপর ভরসা করেন, রোমেরো সেখানে ভরসা করবেন তার শারীরিক উপস্থিতির ওপর। রোমেরোর প্রতিটি ট্যাকল বা ইন্টারসেপশন যেন তার প্রতিপক্ষের মনে এক অদৃশ্য চাপের সৃষ্টি করে।
তাদের এই লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটটাও হতে যাচ্ছে বেশ নাটকীয়। কেইন এখন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন, মৌসুমজুড়ে ৭৩ গোল করে তিনি জার্ড মুলারের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। অন্যদিকে রোমেরো বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করে নিজের সেরাটা দিয়েছেন। মিসরের বিপক্ষে গোল কিংবা কেপ ভার্ডের বিপক্ষে অ্যাসিস্ট রোমেরো প্রমাণ করেছেন, গোলপোস্টের পেছনের কাজ ছাড়াও তিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের গত কয়েক দশকের লড়াইয়ের ইতিহাস বেশ তিক্ত এবং রোমাঞ্চকর। ২০০২ সালের পর এই দুই দেশ আবার বিশ্বকাপে একে অপরের মুখোমুখি। সেই ম্যাচে কেইন যখন চাইবেন ইংল্যান্ডের হয়ে গোল করে নিজের নামের পাশে আরও একটি স্বর্ণালি পালক যোগ করতে, বিপরীতে রোমেরো তখন চাইবেন আর্জেন্টিনার হয়ে ক্লিনশিট নিশ্চিত করে দলকে ফাইনালে নিতে। রোমেরো একাধিকবার বলেছেন, ‘আমাদের ডিএনএ-তে আছে কষ্ট করে জেতা।’ এই কষ্ট করার মানসিকতা আর কেইনের গোল করার তৃষ্ণা যখন ডালাসের মাঠে ধাক্কা খাবে, তখন ফুটবলপ্রেমীরা সম্ভবত একটি স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।
কেইন-রোমেরো এই দ্বৈরথ শুধু সেটপিস বা কর্নারের সময় সীমাবদ্ধ থাকবে না। কেইন যখন ড্রিবল করে ডি-বক্সের দিকে আসবেন, রোমেরো তখন দেওয়াল হয়ে দাঁড়াবেন। আবার আর্জেন্টিনা যখন আক্রমণে উঠবে, তখন কেইন বা অন্যান্য ইংলিশ ডিফেন্ডারদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবেন রোমেরো। এই লড়াইয়ে যিনি জিতবেন, তার দল ফাইনালে যাওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়েই থাকবে।
ফুটবল কিংবদন্তিরা জন্ম নেন এভাবেই, লড়াইয়ের মাধ্যমে। ডালাসের সেমিফাইনাল কি কেইনের গোলবন্যার সাক্ষী হবে, নাকি রোমেরোর অজেয় রক্ষণভাগের বীরত্বগাথা হয়ে থাকবে? বুধবার রাতে সেই উত্তরের অপেক্ষায় সারা বিশ্বের ফুটবল ভক্তরা। দিন শেষে ইতিহাসও হয়তো বলতে বাধ্য হবে, এই দুই তারকার লড়াই ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্নায়ুর যুদ্ধ।