কৃষি ও প্রাণিসম্পদে অভিঘাত

বিপন্ন-বিপর্যস্তদের পাশে দাঁড়ান

এবারের বন্যার প্রথম অভিঘাতের ক্ষত ক্রমেই বড় হয়ে সামনে আসছে। আবহাওয়া ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব দায়িত্বশীল মহলগুলোর সতর্কবার্তা- আরও বন্যা হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সামনে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা জানি, ভয়াবহ বন্যা ও অতি বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অনেক জেলা-উপজেলা প্লাবিত হয়। ভূমিধসে অর্ধশতাধিকেরও বেশি প্রাণহানি ঘটে। লাখ লাখ মানুষের পানিবন্দি অবস্থায় এখনো মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি একই সঙ্গে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। সরকারের তরফে বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের তাগিদ দেওয়া হলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, বন্যার ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ তৎপরতায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ সন্তোষজনক নয়।

দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, বান্দরবান, মৌলভীবাজারসহ কয়েকটি জেলায়  ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি এবং বড় প্রভাব পড়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। কৃষির এ দুটি উপখাতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দুটি প্রতিবেদনে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে মৎস্য খাত। এ খাতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৩৬৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বেশি। আমরা জানি, জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান প্রায় ২.৫৩ থেকে ৩.৬১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এর হার ২২.২৬ শতাংশ। এ খাত দেশের মোট প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। এ ছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আমরা প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করছি। অন্যদিকে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদানও কম নয়। জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ১৬.৫৪ শতাংশ। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও ৫০ শতাংশ মানুষ পরোক্ষভাবে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ করে পোলট্রি, ডেইরি এবং ছাগল-ভেড়া পালনের মাধ্যমে গ্রামীণ পুরুষের আত্মকর্মসংস্থান তো বটেই, নারীর ক্ষমতায়ন-কর্মসংস্থানেও আয়-রোজগারের ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। বন্যার অভিঘাতে ভেঙে পড়া এই দুটি খাতের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর সব শক্তি জোগাতে হবে দেশ-জাতির স্বার্থেই। প্রয়োজনের নিরিখে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা-সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।  

কৃষি খাতও বন্যার অভিঘাতের বাইরে নয়।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে বন্যার হানা ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ইতিমধ্যে কম স্ফীত করেনি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫ লাখের বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজিসহ অন্যান্য ফসল। সার্বিকভাবে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে এই আশঙ্কাও রয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ১৪ জুলাই পাঁচ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫ লাখ কৃষক পাবেন বহুমাত্রিক সহায়তা। মৎস্য-প্রাণিসম্পদ-কৃষি খাতে ইতিমধ্যে নিরূপিত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র যে আরও স্ফীত হবে তাতে সন্দেহ নেই। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি সরকারি উদ্যোগে পুনর্নির্মাণ করা হবে, এও দায়িত্বশীল মহলের তরফে বলা হয়েছে। আমরা সরকারের এসব উদ্যোগকে  সাধুবাদ জানাই। তবে পাশাপাশি এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এমন মহৎ উদ্যোগের ক্ষেত্রে অতীতে অসাধু দায়িত্বশীল অনেকেই নয়ছয়ের ঘটনা ঘটিয়েছেন এবং অনেকে পারও পেয়ে গেছেন। আমাদের অভিজ্ঞতায় আরও আছে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা নিয়েও কম তুঘলকি কাণ্ড ঘটেনি। আমরা আশা করব, এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না এবং আবহাওয়া বিভাগের পুনঃসতর্কবার্তা আমলে রাখা হবে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বরাদ্দ বাড়ানো এবং কার্যক্রম আরও জোরদার করা বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে, সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর মতো কার্যক্রম বিপন্ন-বিপর্যস্তদের কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।