দুর্যোগে প্রান্তিক মানুষের জীবনযুদ্ধ

উপলব্ধি যখন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন তা কতটা নির্মম হতে পারে, তার জ¦লন্ত প্রমাণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার তরুণ রাসেলের অশ্রুসজল চোখ। বন্যার পানিতে ভাসতে থাকা একটি ভেলায় নিজের বাবার নিথর দেহটি যখন সে তুলে দিচ্ছিল, তখন শুধু একটি লাশ নয়, ভাসছিল রাষ্ট্র, সমাজ আর আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার দায়বদ্ধতা। সংবাদপত্রের পাতা উল্টাতেই চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের যে চিত্র চোখে ভেসে ওঠে, তা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের খতিয়ান নয়; বরং আমাদের অধিকার ব্যবস্থার এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী নাম ভিন্ন হলেও কান্না এক। ছয় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। কাঞ্চনা, ঢেমশা, নলুয়া, আমিলাইশ কিংবা জালিয়াঘাটার মতো প্রত্যন্ত গ্রামগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। আর এই দ্বীপগুলোর বাসিন্দারা সেই প্রান্তিক মানুষ, যাদের অধিকারের কথা আমরা সভা-সেমিনারে বলি, কিন্তু দুর্যোগে তাদের ন্যূনতম অধিকারও নিশ্চিত করতে পারি না।

বন্যার পানি যখন ঘর, রাস্তা, ফসল, বিদ্যালয় কিংবা কবরস্থান গ্রাস করে, তখন সবচেয়ে বেশি ডুবে যায় প্রান্তিক মানুষের অধিকার। যার সঞ্চয়, বিকল্প আশ্রয় ও নিরাপদ যোগাযোগ আছে, তার জন্য বন্যা সাময়িক দুর্ভোগ। কিন্তু দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের জন্য এটি অস্তিত্বের সংকট। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না, মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, বিশুদ্ধ পানির অভাবে শিশুরা ঝুঁকিতে পড়ছে, এমনকি মৃত মানুষের মর্যাদাপূর্ণ দাফনও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। একজন মানুষ মৃত্যুর পর নিজের পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত হওয়ার শেষ ইচ্ছাটুকুও পূরণ করতে পারছেন না। এই বেদনা একটি পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের মানবিক দায়বদ্ধতার গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক নীতিমালায় দুর্যোগের সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, যোগাযোগ সহজ এমন এলাকায় ত্রাণের স্তূপ জমে, আর বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলো দিনের পর দিন একটি ত্রাণের নৌকার অপেক্ষায় থাকে। মহাসড়কের পাশের মানুষের কণ্ঠ সহজেই পৌঁছে যায়, কিন্তু বুকসমান পানির মধ্যে আটকে থাকা পরিবারের আর্তনাদ অনেক সময় কোনো ক্যামেরা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে একই ব্যক্তি একাধিকবার ত্রাণ পান, আর অন্য কেউ একটি শুকনো খাবারের প্যাকেটের অপেক্ষায় অনাহারে দিন কাটান। দুর্যোগ তখন প্রকৃতির চেয়ে বেশি নির্মম হয়ে ওঠে ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংকট বিশুদ্ধ পানির। বন্যার পরে দূষিত পানি ও পানিবাহিত রোগই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে ওঠে। শিশু, গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা সবচেয়ে বেশি বিপদে থাকেন। অথচ তাদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা, নিরাপদ স্যানিটেশন ও পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। অধিকাংশ নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানীয় জলের উৎস নষ্ট হয়েছে। ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো জরুরি প্রসবকালীন জটিলতা বা শিশু অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার মতো নৌযানও অনেক সময় নেই। এই মৃত্যুঝুঁকি কি শুধু প্রকৃতির সৃষ্টি, নাকি আমাদের সমন্বয়হীনতার ফল? মানবাধিকার শুধু জীবিত মানুষের নয়, মৃত মানুষেরও। সাতকানিয়ার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফোরকানের লাশের গোসল করানোর মতো শুকনো জায়গাও ঘরে ছিল না; ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে দাফনের জন্য। এই দৃশ্য একটি সভ্য সমাজের জন্য গভীর লজ্জার। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বিকল্প উঁচু স্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। দুর্যোগকে আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে কেবল ত্রাণ বিতরণের বিষয় হিসেবে দেখি, অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে থাকা উচিত মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ যেন রাষ্ট্রের কাছে অদৃশ্য নাগরিক হয়ে না পড়ে, সে জন্য দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি, ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে স্থায়ী সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রবীণদের জন্য আলাদা সুরক্ষা পরিকল্পনা থাকতে হবে। একই সঙ্গে ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নে প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। মানবিক সহায়তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা দ্রুততম সময়ে সবচেয়ে অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছাবে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কেবল বরাদ্দের ঘোষণা নয়, কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। প্রতিটি আক্রান্ত উপজেলায় ‘ট্যাগ অফিসার’ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে ‘মাইক্রো-ম্যাপ’ তৈরি করে দুর্গম এলাকায় চাহিদাভিত্তিক ত্রাণ পৌঁছে দিতে হবে। স্থানীয় নৌযান ও স্পিডবোট রিকুইজিশন করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ এবং দুর্গত ও দুর্গম এলাকায় প্রয়োজনীয় ওষুধসহ ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে। প্লাবিত ইউনিয়নগুলোতে বিকল্প দাফনস্থল নির্ধারণ এবং ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দাফনের জন্য জরুরি কমিটি গঠনও জরুরি।

দুর্যোগ আসবে, আবার চলে যাবে। কিন্তু এবারের বন্যা আমাদের মানবিকতার সামর্থ্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মানবাধিকার কোনো বিলাসী শব্দ নয়, মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তাই মানবাধিকার। প্রধান সড়কের ত্রাণ যেন জলমগ্ন প্রত্যন্ত গ্রামের ক্ষুধার্ত মানুষকে আড়াল না করে। রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজের প্রতি আজ একটাই আহ্বান মানবিকতাকে মহাসড়কের পাশে আটকে রাখবেন না; নৌকায় তুলে পৌঁছে দিন সেসব দুয়ারে, যেখানে এখনো মানুষ এক মুঠো খাবার, এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি আর সামান্য মর্যাদার প্রতীক্ষায় রয়েছে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও অধিকারকর্মী

shahedkayes@gmail.com