কওমি মাদ্রাসায় সাহিত্য সাধনার অগ্রপথিক

কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)। বাংলাদেশের আলেম সমাজের ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। জ্ঞান ছিল তার শক্তি। সাহিত্য ছিল তার অনুরাগ। শিক্ষা ও সমাজসংস্কার ছিল তার আজীবনের সাধনা। ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চাকে কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি রেখে গেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। আলেম, শিক্ষাবিদ, লেখক, চিন্তাবিদ ও সমাজসংস্কারক হিসেবে তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.) ১৯৩৩ সালের ১৫ জুন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কাজী সাখাওয়াত হুসাইন ছিলেন আলেম ও রাজনীতিবিদ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে যশোরের লাউড়ি আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে গিয়ে হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। সেখানে তিনি শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তার কাছ থেকেই হাদিসের সনদ গ্রহণ করেন।

দেশে ফিরে ১৯৫৭ সালে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বড়কাটারা মাদ্রাসা, জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ, কাতলাসেন আলিয়া মাদ্রাসা এবং জামিয়া শরইয়্যাহ মালিবাগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, শায়খুল হাদিস ও পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি জামিয়া শরইয়্যাহ মালিবাগের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। কিছু সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে ধর্মীয় অনুশাসন পালনে বিঘœ ঘটছে মনে করে তিনি সেই পদ ছেড়ে দেন।

কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)-এর অন্যতম বড় অবদান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায়। এমন এক সময়ে তিনি কওমি মাদ্রাসায় বাংলা ভাষায় পাঠদানের ব্যবস্থা চালু করেন, যখন মাতৃভাষায় ইসলামি শিক্ষার চর্চা ছিল খুবই সীমিত। তিনি সাহিত্যসভা, বক্তৃতা প্রশিক্ষণ, দেওয়াল পত্রিকা ও বার্ষিক স্মরণিকা প্রকাশের প্রচলন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদসহ বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন কবি ও সাহিত্যিকের রচনা তিনি গভীর আগ্রহ নিয়ে অধ্যয়ন করতেন। তার হাত ধরেই বহু আলেম সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত হন।

তিনি ছিলেন একজন দক্ষ লেখক ও সম্পাদক। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত বহু তাফসির, হাদিস ও ধর্মীয় গ্রন্থের সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বহু গ্রন্থনা রচনা ও অনুবাদ করেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও তার বিচক্ষণ উপস্থিতি ছিল। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আলেম সমাজের মর্যাদা রক্ষায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ব্যক্তিজীবনে কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, আত্মসংযমী ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিবেদিত। জ্ঞানের সঙ্গে চরিত্র গঠনকে তিনি সমান গুরুত্ব দিতেন। তার বিশ্বাস ছিল, শিক্ষা মানুষের নৈতিক উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণের পথ খুলে দেয়।

২০১৩ সালের ১৫ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন। ঢাকার খিলগাঁওয়ে জানাজা শেষে তাকে শাহজাহানপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।