আবু সাঈদের ছবিই সান্ত্বনা মায়ের

মঙ্গলবার সন্ধ্যা। ছেলে শহীদ আবু সাঈদের কবরের লোহার বেড়া ধরে অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মা মনোয়ারা বেগম। চোখমুখে হতাশা ও বিষণœতার ছাপ। ছেলেকে হারানোর দুই বছর পার হতে চলেছে। মনে হচ্ছে ছেলেকে দেখার ব্যাকুলতায় আচ্ছন্ন তিনি। কথা বলতেই তিনি জানালেন ওর একটা ছবি আছে আমার কাছে সেটাই আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন।

মনোয়ারা বেগম জানালেন, ‘আবু সাঈদ তার মানিব্যাগে আমার ও তার ছবি রেখে বারবার দেখত। কোথাও গেলেই বলত ‘মা, তোমার ছবিটা আমার সঙ্গে আছে।’ এখন সে নেই, আমি ওর ছবিটা দেখি। যতবার ওর ছবি খুলি, ততবার মনে হয় বুকের ভেতরটা আবার ফেটে যাচ্ছে। ওর ছবিটা মাঝে মধ্যে বুকে চেপে ধরে ঘুমাই।’ কথাগুলো বলতে বলতে কবরের পাশে কান্নায় ভেঙে পড়েন আবু সাঈদের মা।

মনোয়ারা বেগম আরও বলেন, ‘একদিন আমার ছবিটাই ছিল ওর সবচেয়ে আপন স্মৃতি। আর আজ ওর ছবিটাই আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন। ওর ছবি বের করলেই মনে হয়, আমার সোনার ছেলে যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। কত কথা বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু কোনো উত্তর পাই না।’

শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন জানান, আবু সাঈদের স্মৃতিগুলো আজও বাড়ির প্রতিটি জায়গায় আছে। তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বই, পোশাক সবই আগের মতো যতেœ সংরক্ষণ করে রেখেছি। তবে মায়ের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে উঠেছে ছেলের ছোট্ট একটি ছবি।

প্রতিবেশী এক নারী জানান, আবু সাঈদের মা প্রায়ই নীরবে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। কখনো চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, ‘আল্লাহ, আর একবার যদি আমার ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম!’

একটি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক মায়ের সীমাহীন ভালোবাসা, অপূরণীয় শূন্যতা আর আজীবনের অপেক্ষা। যে মানিব্যাগে একদিন ছেলে আগলে রেখেছিল মায়ের ছবি, আজ সেই ছেলের ছবিই মা আগলে রেখেছেন। এ ছবি তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের মুখ। যে মুখ প্রতিদিন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, সন্তানের শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হয় না।

‘বিচারটা যেন দেখে যেতে পারি’ : শহীদ আবু সাঈদের বিচার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার বাবা মকবুল হোসেন। তিনি বলেন, আবু সাঈদসহ আন্দোলনে নিহতদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং বিচার নিশ্চিত হলে শহীদ পরিবারগুলো কিছুটা হলেও শান্তি পাবে। যে বিচার হইছে তাতে আমরা খুশি নই। তারপরও যে বিচারটা করছে, সেটিরও কোনো অগ্রগতি নেই। বিচার হবে কি না, করবে কি না সেটারও কোনো গতি নেই। সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন আমি বৃদ্ধ মানুষ, আমি যেন জীবিত থাকতে এ বিচারটা দেখে যেতে পারি। অপরাধীর বিচার হোক। তাহলে মনে হবে, আমার সন্তানের জন্য ন্যায়বিচার হয়েছে।’ গতকাল তিনি এসব কথা বলেন।

ছেলেকে হারানোর গভীর বেদনা বুকে নিয়েও বাবা মকবুল দেশের শান্তি চান। তিনি বলেন, ‘দেশ ও দেশের মানুষ যেন শান্তিতে থাকে এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া। আমার ছেলে যে বৈষম্যের জন্য জীবন দিয়েছে, সেই বৈষম্য যেন আর না থাকে। দেশের মানুষ যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারে। সবাই যেন সমান অধিকার পায়। আমার নিজের স্বার্থে আমি কিছু চাই না, দেশ যেন শান্তিতে থাকে তাহলে আমি শান্তি পাব।’

আবু সাঈদের বীরত্বগাথা স্মরণ করে মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়। দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক, সবাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জীবনযাপন করুক এবং আগামীর প্রজন্ম একটি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ দেখুক। একজন শোকাহত বাবা হিসেবে সরকারের কাছে এটাই আমার বড় চাওয়া। আবু সাঈদ যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, সেই বাংলাদেশ গড়ে উঠুক। দেশের মানুষের মধ্যে যেন বিভেদ না থাকে।’

প্রসঙ্গত, শহীদ আবু সাঈদ রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর জাফরপাড়া গ্রামের মকবুল হোসেন ও মনোয়ারা বেগম দম্পতির ছেলে। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়সংলগ্ন পার্ক মোড়ে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের গুলির মুখে আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকেন। আবু সাঈদের বুকে পুলিশের গুলি করার দৃশ্য গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে এবং তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীকে পরিণত হন। কোটা সংস্কারের দাবি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের আন্দোলনে মোড় নেয়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। 

আজ ‘জুলাই শহীদ দিবস’ : আজ বৃহস্পতিবার ‘জুলাই শহীদ দিবস’। জুলাই অভ্যুত্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে দ্বিতীয়বারের মতো দিবসটি পালন করা হবে। এ উপলক্ষে আজ নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আন্দোলনের সময় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। তিনি বিশ^বিদ্যালয়টির ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ হত্যাকান্ডের পর সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রতিবাদ ও আন্দোলনে সোচ্চার হন শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এরই ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থানের মুখে ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়।

জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক আন্দোলন বা অর্জন নয়; এটি ছিল গণতন্ত্রকামী মানুষের সম্মিলিত আকাক্সক্ষা ও আত্মত্যাগের ফসল।’

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে দুই হাত প্রসারিত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ আবু সাঈদের সেই অমলিন দৃশ্য কেবল একটি মুহূর্ত ছিল না, সেটি ছিল গণতান্ত্রিক অধিকারবঞ্চিত একটি জাতির ভয় জয়ের প্রতীক। ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে গতকাল রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বাণীতে তিনি এ কথা বলেন। বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, শোক ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দেশের সর্বক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।