শ্রাবণের গগনের গায় বিদ্যুৎ চমকিয়া যায়
ক্ষণে ক্ষণে শর্বরী শিহরিয়া উঠে, হায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলা সনের চতুর্থ এবং বর্ষাকালের প্রধান মাস-শ্রাবণ। ‘শ্রাবণা’ নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এ মাসের নামকরণ হয়েছে। এর মূল আকর্ষণ অঝোর ধারায় বৃষ্টি ও সতেজ প্রকৃতি। আষাঢ়ের পানিতে খাল-বিল, নদী-নালা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। প্রাণবন্ত রূপ নেয় সবুজ মাঠ আর ফসলের ক্ষেত। শ্রাবণ মাস একদিকে জমিতে নতুন ফসল ফলানোর সময়, অন্যদিকে পশুপাখির মিলনের সময় এটি। সেই কারণে অধিকাংশ ন্যাশনাল পার্ক শ্রাবণ মাসে বন্ধ থাকে। সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী শ্রাবণ মাসে দেবতা ও অসুরদের দ্বারা ‘সমুদ্র মন্থন’ হয়েছিল। সেই মন্থন থেকে নির্গত, ‘হলাহল’ নামের বিষ পান করে ‘নীলকণ্ঠ’ হয়েছিলেন মহাদেব। পরে মা কণ্ঠ চেপে ধরলে তার কণ্ঠ নীলবর্ণ ধারণ করে এবং তিনি ‘নীলকণ্ঠ’ নামে পরিচিত হন। বিষের জ্বালা জুড়াতে দেবতারা তার মাথায় জল ঢেলেছিলেন এই বিশ্বাস থেকে শ্রাবণ মাসে সনাতন ধর্ম অনুযায়ী, শিবের মাথায় পানি ঢালার প্রথা চলে আসছে।
শিবকে পাওয়ার জন্য দেবী পার্বতী শ্রাবণ মাসে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। ফলে অবিবাহিতরা ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়া এবং বিবাহিতরা পরিবারের সুখ-শান্তির জন্য শ্রাবণে উপবাস ও ব্রত পালন করেন। এই সময় বিভিন্ন ফুলের গন্ধ নাকে আসে। মানুষের হৃদয়কে অজানা ভালো লাগায় শিহরিত করে। মনে হয়, এই তো আমার দেশ আমার জন্মভূমি; যেখানকার প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে আছে বৈচিত্র্য।
বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে রবীন্দ্রসাহিত্যে শ্রাবণের বৃষ্টি বিশেষ আবেগের জায়গা দখল করে আছে। ‘বাদরদিনের প্রথম কদম ফুল’ কিংবা ‘এমন দিনে তারে বলা যায়’ সৃষ্টির মাধ্যমে শ্রাবণের রূপ ও প্রেম চিরকাল ধরা পড়ে। ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে’ গীতিকথায় বর্ষার অবিরাম বৃষ্টির শব্দ ও পরিবেশকে তুলে ধরা হয়েছে। মেঘলা ও বৃষ্টিস্নাত দিনে কবির মনের ভেতরও এক অজানা উদাসীনতা ও চঞ্চলতা কাজ করেছিল। বাইরে বৃষ্টির অবিশ্রান্ত ধারার সঙ্গে নিজের ভেতরের আবেগ ও স্মৃতির এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে এই গানে। সংস্কৃত ‘বর্ষা’ বা প্রাকৃত ‘বাদর’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। ‘মুণ্ডারি’ ভাষার শব্দ ‘বাদর’ থেকে ‘বাদল’ এসেছে বাংলায়। রবীন্দ্রনাথ ‘বাদরদিনে’ বলতে, অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে এমন মুখরিত বা মেঘলা দিনকে বুঝিয়েছেন। তিনি মৃত্যুবরণও করেছিলেন শ্রাবণ মাসের ২২ তারিখে।
আজ থেকে শ্রাবণ মাস শুরু। তামিল পঞ্জিকা মতে এটি ‘আবাণী’ মাসের পঞ্চম মাসের সঙ্গে মিলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, শ্রাবণ মাসে মানুষের পেটে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে। এই সময়ে মানুষের দেহে বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়। ফলে বেশি তৈলাক্ত, মসলাদার খাবার শ্রাবণে বর্জন করা উচিত। সম্ভব হলে নিরামিষ খাওয়া সবচেয়ে ভালো। শ্রাবণের শেষে ভাদ্র মাসে, আরেক রূপে সাজবে প্রকৃতি।