জন্মের পর বাবা-মা শখ করে নাম রাখেন আব্বাস উদ্দিন। স্কুলেও ভর্তি করান এ নামেই। কিন্তু বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে পা বাড়ান অপরাধে। জড়িয়ে পড়েন হত্যার নেশায়। ঢাকার ভাসানটেক, কাফরুল ও মিরপুর এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে পুলিশের খাতায় নাম ওঠে ‘কিলার আব্বাস’ হিসেবে। উত্তরায় ‘নিলয়’ অভিজাত পরিবারের সন্তান। পড়ালেখা করেছেন নামিদামি স্কুলে। বছর দুয়েক আগে জড়িয়ে পড়েন কিশোর গ্যাংয়ের গ্রুপে। নানা অপরাধ করার পর সাধারণ ছেলেটি এখন নিজেকে পরিচয় দেন ‘ডেঞ্জারাস নিলয়’ নামে। পুলিশের খাতায়ও পরিচিত এই নামে। স্কুলের পর আর শিক্ষার গণ্ডি পার হয়নি তার।
এই দুজনের মতোই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের দাগি অপরাধীদের নামের আগে দেখা যায় এমন ‘খেতাব’। নাম শুনলেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নানা অপকর্মে জড়িত এসব সন্ত্রাসী আসল নামের চেয়ে খেতাবি পরিচয়েই পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বেশি পরিচিত। অনেকের নামে হত্যাকাণ্ডসহ আছে বিভিন্ন মামলা। কেউ কেউ আছেন কারাগারে। আবার কেউ দেশের বাইরে থেকে পরিচালনা করছেন অপরাধ চক্র।
বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, অপরাধ ও সন্ত্রাসের অন্ধকার জগতে রয়েছে অদ্ভুত ও বিচিত্র সংস্কৃতি। সেখানে সাধারণ নামের তেমন জায়গা নেই, বরং ‘কালা’, ‘পিচ্চি’, ‘লম্বু’, ‘হাতকাটা’, ‘সুন্দরী’, ‘ডেভিলস ড্রপ’ ‘জঙ্গিবাদ ডটকম’ কিংবা ‘জিহাদি জন’-এর মতো রোমহর্ষক সব নামের ছড়াছড়ি। প্রথম শুনলে এ ধরনের নামধারীদের রহস্যোপন্যাস বা সিনেমার চরিত্র মনে হতে পারে। তবে বাস্তবে ভয়ংকর অপরাধীরা আসল পরিচয় ঢাকা দিতে ব্যবহার করেন ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড ছদ্মনাম’।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সন্ত্রাসীদের ভয়ংকর ও অদ্ভুত নাম ধারণের পেছনে জটিল মনস্তত্ত্ব, অপরাধপ্রবণতা এবং নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের নগ্ন প্রতিযোগিতা জড়িত। অপরাধ জগতে টিকে থাকার প্রধান অস্ত্র হচ্ছে ‘ভয়’। একজন ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষকে যখন বলা হয় ‘আমি অমুক বলছি’, তখন নামের আগের ‘বাহারি’ বিশেষণটিই অর্ধেক ভীতি তৈরি করে দেয়। এটি যেকোনো অপরাধীর জন্য এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা তৈরি করে। একজন ব্যক্তি ‘কালা জাহাঙ্গীর’ বা ‘রকি’র মতো কোনো নাম ধারণ করে ভাবার চেষ্টা করেন, অপরাধগুলো তিনি করছেন না, করছে তার ওই ‘অপরাধী চরিত্রটি’। আবার পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে বিভ্রান্ত করতেও ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়। প্রকৃত নাম গোপন থাকায় প্রাথমিক তদন্তে বেগ পেতে হয় পুলিশকে।
আন্ডারওয়ার্ল্ডে খেতাবি নামের প্রচলন : নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের নামের আগে খেতাব ব্যবহার করার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। ২০০১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করার পর বিচিত্র নামগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড ও হাতিরপুল এলাকার অপরাধ জগতে আসার আগে মুরগির ব্যবসা করতেন মিলন। সেখান থেকেই তার নাম হয়ে যায় ‘মুরগি মিলন’। পরে তিনি বড় গ্যাংস্টার হয়ে উঠলেও এই নাম আর বদলায়নি।
পুুরস্কার ঘোষণাতেও নামে খেতাবি : ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসী ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তাদের মধ্যে বেশিরভাগের নামের পেছনেই ‘খেতাব’ আছে। তালিকার মধ্যে ১৩ জন বিদেশে আত্মগোপন করেছেন। মারা গেছেন ৩ জন। একজনের হদিস নেই। দেখতে ছোট হওয়ায় হান্নানের নাম হয়ে যায় ‘পিচ্চি হান্নান’। তেজগাঁও ও কারওয়ান বাজারের ত্রাস ছিলেন তিনি। র্যাবের প্রথম ক্রসফায়ারে মারা যান পিচ্চি হান্নান। কাফরুল ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকাসহ ঢাকার আশপাশ এলাকার ত্রাস ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। গায়ের রঙ আফ্রিকানদের মতো কালো হওয়ায় তার নামের আগে ‘কালা’ শব্দ যুক্ত হয়ে যায়। কালা জাহাঙ্গীর বর্তমানে কোথায় আছেন সে ব্যাপারে পুলিশের কাছে তথ্য নেই। তবে জনশ্রুতি আছে তিনি মারা গেছেন।
মোহাম্মদপুরে আরেক ত্রাস হেলালের শারীরিক গঠনের কারণে নাম হয় ‘পিচ্চি হেলাল’। এক সময় ফ্রিডম পার্টির রাজনীতি করায় সোহেল আহমেদের নাম হয়ে যায় ‘ফ্রিডম সোহেল’। মগবাজার ও রমনা এলাকায় দাগি অপরাধী ফতেহ আলী সুব্রতের নাম হয় সুব্রত বাইন। এক সময় ঢাবি এলাকায় টোকাই ছিলেন আমিন রসুল সাগর। অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় নামের আগে উপাধি হয় টোকাই সাগর। পুরস্কার ঘোষণার পর তিনি চলে যান আমেরিকায়। মগবাজারের শীর্ষ অপরাধী কামরুল হাসান হান্নান দেখতে অনেক ছোট হওয়ায় তার নাম হয় ছোট হান্নান। দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চোখের ত্রুটির কারণে সুমনের নাম হয়ে যায় ‘ট্যারা সুমন’। নব্বইয়ের দশকের সন্ত্রাসী সেন্টু সবসময় দুটি পিস্তল সঙ্গে রাখতেন। নিখুঁত নিশানায় গুলি করার দক্ষতার কারণে অপরাধ জগতে তিনি ‘পিস্তল সেন্টু’ নামে পরিচিতি পান। অন্যদিকে বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি নয়ন নিজেকে বিখ্যাত ব্রিটিশ স্পাই চরিত্র অনুকরণে ‘নয়ন বন্ড’ নাম দিয়েছিলেন। তার পুরো গ্যাংয়ের নাম ছিল ‘০০৭’। তাছাড়া ‘ডিস্কো বয়েজ’, ‘নাইন স্টার’, ‘ফার্স্ট গিয়ার’, ‘লেডি গ্যাংস্টার’ ও ‘টিকটক অপু’র মতো নাম দিয়ে তরুণীরাও অপরাধমূলক সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ছেন।
নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে আন্ডারওয়ার্ল্ড : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই আন্ডারওয়ার্ল্ড উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দেশের বাইরে থাকা সন্ত্রাসীরা নিজেদের সহযোগীদের মাধ্যমে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। এমনকি কারাগারে থাকা সন্ত্রাসীরাও সহযোগীদের নানা বিষয়ে বার্তা দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি, চোরাকারবারিসহ ভিন্ন ধরনের অপরাধীরা দুবাই, মালয়েশিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে ছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশে এসেছেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধ জগতে নামের বাহার ছড়িয়ে অপরাধীরা অপকর্ম করছে। এসব দাগি অপরাধীদের ধরতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একই কথা বলেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা নামের আগে উপাধি ব্যবহার করে অপকর্ম করছে। এসব অপকর্ম রোধ করতে পুলিশের সবকটি ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের নামের বাহার দেখলে আসলেই ভয় লাগে। কারণ উল্টোপাল্টা নাম শুনলে ভুক্তভোগীরা বেশি ভয় পান। তাছাড়া পুলিশও মাঝেমধ্যে সন্ত্রাসীদের নামের আগে খেতাব জুড়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের বাবা-মায়ের দেওয়া নামটি হারিয়ে যায় চিরতরে। এই সমাজ তাকে আর ভালো হতে দেয় না।’