গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম ইতিমধ্যে চলমান রয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে ছাত্রদলের উদ্যোগে আয়োজিত ‘গণ-অভ্যুত্থানের বাঁকবদলের দিন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ব্যক্তি ও সংগঠন উভয়েরই বিচার করা সম্ভব। আমরা চাই, বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই ফ্যাসিবাদী সংগঠনের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারিত হোক। প্রশাসনিক আদেশে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করাকে আমরা সঠিক মনে করি না। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব অবৈধভাবে সরকার পরিচালনা করেছে এবং দলটির নেতাকর্মীদের মাধ্যমেই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। তাই ব্যক্তি নয়, সংগঠন হিসেবেও আওয়ামী লীগকে বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নুরেমবার্গ ট্রায়ালের উদাহরণ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেভাবে হিটলারের নাৎসি সংগঠন ও গেস্টাপোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, বাংলাদেশেও তেমন একটি বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন রয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ, এমনকি শিশুদেরও হত্যা করা হয়েছে, যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, এই গণহত্যার জন্য আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তারা জুলাইয়ের যোদ্ধাদের ‘জঙ্গিবাদী’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদের উত্থান হতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে যাতে কোনো স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক সংগঠনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল দেশের আপামর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান। ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য অটুট রেখে শহীদদের প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। গণভবনকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল। স্বাগত বক্তব্য দেন ছাত্রদলের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির। অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতা এবং আন্দোলনে আহত ও শহীদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন আইন মানব পাচার দমনে ভূমিকা রাখবে : ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তির অপব্যবহার রুখতে এবং মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে প্রণীত নতুন আইন অত্যন্ত কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, অপরাধীচক্রের পরিবর্তনশীল কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ‘মানব পাচার এবং অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ বিষয়ক জাতীয় অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম নতুন আইন প্রণয়নের প্রেক্ষাপট, যৌক্তিকতা এবং প্রধান বিধান উপস্থাপন করেন। এরপর আইন বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির, কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল জিয়াউল হক, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ।