নির্ঘুম রাত কাটছে বাসিন্দাদের

পদ্মার করালগ্রাস আর তীব্র নদীভাঙনের আতঙ্ক থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে নদীপাড়ের মানুষগুলো বুকে আশা বেঁধেছিলেন স্থায়ী বসতির। যুগ যুগ ধরে চলা সর্বনাশা ভাঙন ঠেকাতে যখন পদ্মার তীরে স্থায়ী নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হলো, তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল স্বস্তির আলো। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন এবার হয়তো মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু আর হারাতে হবে না, রক্ষা পাবে শেষ সম্বলটুকু। কিন্তু সেই স্বপ্ন বেশি দিন টেকেনি। মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই সেই স্বপ্ন ভেঙে যেতে শুরু করেছে।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া ইউনিয়নে নির্মিত নদী তীর রক্ষা বাঁধের একটি অংশ পদ্মার প্রবল স্রোতে ধসে পড়েছে। বাঁধের সিসি ব্লক একের পর এক সরে গিয়ে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় নতুন করে ভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাজুড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশের আশপাশে বসবাসকারী পরিবারগুলো রাত কাটাচ্ছেন উৎকণ্ঠায়। অনেকেই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ঘরের মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও আক্ষেপ ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা তীব্র হতাশা প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলছেন যে বাঁধকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নদীভাঙনের ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, সেটি উদ্বোধনের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কেন এমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল? নির্মাণকাজের গুণগত মান এবং স্থায়িত্ব নিয়ে এখন চারদিকে উঠছে শত শত প্রশ্ন। স্থায়ী মুক্তির যে স্বপ্ন গাঁওদিয়াবাসী দেখেছিলেন, তা এখন পদ্মার করালস্রোতেই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।

এদিকে, সংশ্লিষ্টরা পলি বস্তায় বালু ভরে ভাঙন ঠেকানোর জন্য বাঁধ দিচ্ছে। ভাঙনের এলাকায় বাঁশ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ওই এলাকার বাসিন্দারা মালামালসহ ঘরগুলো খুলে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী মনিরুল ইসলাম জানান, গত রবিবার বিকেলে এক আকস্মিক বিপর্যয় নেমে আসে গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে। গাঁওদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে নদী তীররক্ষা বাঁধে হঠাৎ করেই তীব্র ধস দেখা দেয়। কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা কিংবা বিকট শব্দ ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে বাঁধের সিসি ব্লকগুলো পদ্মার করালগ্রাসে তলিয়ে যেতে শুরু করে। প্রথমে মাত্র কয়েকটি ব্লক ধসে পড়লেও, চোখের পলকে তা এক বিশাল ও ভয়াবহ ফাটলে রূপ নেয়। আকস্মিক এই ভাঙনে পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নদীর একদম কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলো জীবন ও শেষ সম্বল রক্ষায় দিগি¦দিক ঘরবাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে শুরু করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাগর বলেন, বিকেলে হঠাৎ দেখি বাঁধের ব্লক ভেঙে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। রাতে আমরা আতঙ্কে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছি। এখন বুঝতে পারছি না, কোথায় থাকব। পদ্মার ভাঙনে লৌহজংয়ের এই অঞ্চলের মানুষ বহুবার সর্বস্ব হারিয়েছেন। নদীর আগ্রাসনে বসতভিটা হারিয়ে নতুন জায়গায় আশ্রয় নেওয়া অনেক পরিবারের কাছে এই বাঁধ ছিল নিরাপত্তার শেষ ভরসা।

আব্দুল লতিফ খান বলেন, ৩০ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সব হারিয়েছি। বাঁধ হওয়ার পর মনে হয়েছিল এবার শান্তিতে ঘুমাতে পারব। কিন্তু দেড় মাসের মধ্যেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা যাব

কোথায়? রিতা রানী দে বলেন, বাঁধ দেখে মনে হয়েছিল আর ভয় থাকবে না। এখন আবার মনে হচ্ছে সব হারানোর সময় এসেছে। স্থানীয় মনির বলেন, আগে অনেক জায়গা-জমি নদীতে গেছে। এখানে এসে ভেবেছিলাম অন্তত থাকার জায়গাটা থাকবে। এখন সেই জায়গাটাও ঝুঁকিতে পড়েছে।

স্থায়ী বাঁধে এত দ্রুত ধস নামায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে সামনে নদীর পানি ও স্রোত আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু জরুরিভিত্তিতে ব্লক বসালেই হবে না; বাঁধের নকশা, নির্মাণ কাজের মান এবং ব্যবহৃত উপকরণের গুণগত বিষয়ও যাচাই করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গাঁওদিয়া বাজারসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ঘটনার পর গত সোমবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু। তিনি বলেন, সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। রাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা উপস্থিত হয়ে ফাটল স্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, এখন ভয়ের কোনো কারণ নেই। খবর পাওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে রয়েছেন।

উল্লেখ্য, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলাধীন বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটি অক্টোবর ২০২১ সাল থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ মেয়াদকাল থাকলেও পরবর্তীতে মেয়াদকাল বাড়ানো হয়েছে। ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দে ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার নদীর তীরবর্তী এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ কাজের ধীরগতি।