মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইরান। একই সময়ে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় টানা ছয় ঘণ্টার বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সূত্র বিবিসি।
ইরান দাবি করেছে, তারা জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ার পরও টানা ষষ্ঠ দিনের মতো নতুন করে সংঘর্ষ চলতে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সেখানে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল করতে ইরানের একাধিক স্থানে ছয় ঘণ্টাব্যাপী সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, তেহরানকে অবশ্যই 'সংযত আচরণ' করতে হবে, অন্যথায় আরও সামরিক পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে। মঙ্গলবার তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলারও হুমকি দেন, যদি তেহরান আলোচনায় ফিরে না আসে।
তবে ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, 'যে কোনো চুক্তি যদি ইরানের স্বার্থ রক্ষা না করে, তবে তা মেনে চলার কোনো কারণ নেই।' তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখাই দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ হামলায় ইরানের কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলার আওতায় ছিল বন্দর আব্বাস বন্দরনগরী ও গ্রেটার তুনব দ্বীপসহ বেশ কয়েকটি এলাকা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি জানান, পশ্চিমাঞ্চলীয় আহভাজ শহরে একটি শিশু ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রের পাশের এলাকায় হামলা হওয়ায় রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
হামলার কিছুক্ষণ পরই উপসাগরীয় দেশগুলোতে নতুন উত্তেজনা দেখা দেয়। কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের শান্ত থাকার পাশাপাশি নিকটস্থ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, সর্বশেষ হামলায় জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সংরক্ষণাগারও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি এখনও কার্যত বন্ধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে তেহরান এ নৌপথে চলাচল সীমিত করে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আবারও অবরোধ কার্যকর করেছে। গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অংশ হিসেবে এই অবরোধ সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
পরদিন মার্কিন বাহিনী কুরাসাওর পতাকাবাহী একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারে গুলি চালিয়ে সেটিকে অচল করে দেয়। সেন্টকমের দাবি, জাহাজটি অবরুদ্ধ একটি ইরানি বন্দরের দিকে যাচ্ছিল।
এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সতর্ক করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য তেল ও গ্যাস রপ্তানি পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে কোন কোন রুটের কথা বলা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান এ সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে তেলবাহী জাহাজের চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
তবে সংঘাতের মধ্যেও একটি ইতিবাচক ইঙ্গিতের কথা উল্লেখ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আটক হওয়া মার্কিন নাগরিক ডেনা কারারিকে মুক্তি দিয়েছে ইরান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, 'ইরানের এই সদিচ্ছার পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানায়।'
ডেনা কারারির আইনজীবী জ্যারেড জেনসার জানিয়েছেন, তিনি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।