মেসি-ইয়ামালের সেই ছবির গল্প

চোখ বন্ধ রেখে একবার কল্পনা করুন, নিস্তব্ধ একটা ড্রেসিংরুম, মেঝেতে রাখা প্লাস্টিকের একটা পানির গামলা, তার পাশে অস্বস্তিতে দাঁড়িয়ে আছেন একজন লাজুক তরুণ। তার হাতে একটা শিশু, যাকে সে জানেই না কীভাবে ধরতে হয়। কেউ তখন কল্পনাও করেনি, এই ছবিটাই একদিন ফুটবল ইতিহাসের এক ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হবে। ভাগ্য তখনই এমন এক চিত্রনাট্য লিখে ফেলে, যা হয়তো হলিউডের কোনো নামি গল্পকারও ভাবতে সাহস পেতেন না। সেই তরুণ এখন ফুটবলের কিংবদন্তি, আর কোলের শিশুটি তারই মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াবে, সেটাও বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো সবচেয়ে ঐতিহাসিক মঞ্চে।

সময়টা ২০০৭ সালের ডিসেম্বর। বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যুর ড্রেসিংরুমে সেদিন এক নীরব ইতিহাস তৈরি হয়, যা কারও চোখেই ধরা পড়েনি। একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য নিছক একটা ছবি তোলা হচ্ছিল। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো তরুণটির নাম লিওনেল মেসি। আর তার কোলে থাকা কয়েক মাস বয়সী শিশুটির নাম লামিন ইয়ামাল। কেউ জানত না, সময় নামের এক অদৃশ্য কারিগর সেদিন তাদের ভবিষ্যৎকে একই সুতোয় বেঁধে দিচ্ছিল। সেদিনের স্মৃতি হাতড়ে ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ট বলেন, ‘ছবিটা তোলা মোটেও সহজ ছিল না। সত্যি বলতে, রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হয়েছিল।’ তার ক্যামেরায় বন্দি হয় অসাধারণ কিছু দৃশ্য। তবে মেসি ছিলেন পুরোপুরি জড়সড়, যিনি চুপচাপ নিজেকে খোলসে বন্দি করে রাখতেই বেশি পছন্দ করেন। সেদিন মেসির অস্বস্তি ক্যামেরার লেন্সে ধরা জোয়ান বলেন, ‘তিনি ড্রেসিংরুমে ঢুকে দেখলেন, একটা প্লাস্টিকের গামলায় পানি, আর তাতে একটা ছোট্ট শিশু। প্রথমে মেসি বুঝতেই পারছিলেন না, কীভাবে তাকে ধরে কোলে নিতে হবে।’ কিন্তু তারপর ঘটে সেই জাদুকরী মুহূর্ত। জন্ম নেয় এমন একটা ফ্রেম, যা পরে হয়ে ওঠে সময়ের এক অলঙ্ঘনীয় সাক্ষী।

বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন, স্থানীয় সংবাদপত্র দিয়ারিও স্পোর্ট আর ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রতি বছর দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য খেলোয়াড়দের নিয়ে এমন শত শত ছবি তোলা হতো। সেসব ছবির প্রায় সবই সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। কিন্তু নিয়তি বেছে নিয়েছে একটাকেই। মেসি আর ইয়ামালের সেই ছবি, যা লুকিয়ে ছিল প্রায় সতেরোটা বছর, নীরবে অপেক্ষা করছিল সঠিক মুহূর্তের জন্য।

২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে স্পেন। ওদিকে কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। দুই চ্যাম্পিয়ন মিলে ফিনালিসিমার লড়াইয়ের আলোচনার মধ্যে হঠাৎই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে সেই পুরনো ছবি। ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই নিজেই সেটা পোস্ট করে লেখেন, ‘দুই কিংবদন্তির শুরু।’ এক লহমায় গোটা ফুটবল বিশ্ব থমকে দাঁড়ায়, এটা কীভাবে সম্ভব! যে ছেলেটা আজ ইউরোপের মাঠ কাঁপাচ্ছে, তারই শৈশবের প্রথম স্পর্শ লুকিয়ে ছিল স্বয়ং মেসির কোলে!

২০০৭ সালে মেসি তখন সবে আলোচনার পাদপ্রদীপে এসেছেন। বার্সেলোনায় রোনালদিনহো, স্যামুয়েল ইতো, জাভি, ইনিয়েস্তা, পুয়োলদের মতো তারকাদের বিশাল ছায়ায় নিজের জায়গা খুঁজছিলেন এই আর্জেন্টাইন। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে এই কিশোর ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাম হয়ে ওঠেন। আটটি ব্যালন ডি’অর, অসংখ্য রেকর্ড, আর ২০২২ সালে সেই একমাত্র অধরা স্বপ্ন বিশ্বকাপ, যা তাকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। অন্যদিকে সেই কোলের শিশুটিও নীরবে বেড়ে উঠতে থাকে নিজের নিয়তির দিকে। মাত্র ৭ বছর বয়সে লা মাসিয়ায় পা রাখেন ইয়ামাল, এরপর ঝড়ের মতো উত্থান। মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে লা লিগায় অভিষেক। একই বছরে স্পেন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ান। প্রতিটি পদক্ষেপই যেন ইতিহাসের পাতায় নতুন রেকর্ড খোদাই করেন ইয়ামাল। ২০২৪ ইউরোতে স্পেনের শিরোপা জয়ের নায়কদের একজন তিনি। ১৯ ছুঁইছুঁই বয়সেই বিশ্ব তাকে চেনে ফুটবলের নতুন বিস্ময় হিসেবে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, সেই ছবির কারিগর খোদ জোয়ানও জানতেন না তার তোলা ছবির শিশুটি কে। ২০২৪ সালে ছড়িয়ে পড়ার পর তারই এক পুরনো সহকর্মীর ফোন কলে খোলে রহস্যের জট। এ নিয়ে বিস্ময় ঝরে জোয়ানের কণ্ঠে, ‘সে জিজ্ঞেস করল, ছবিটা কি আমার তোলা? আমি বললাম, হ্যাঁ। তারপর সে বলল, এই শিশুটাই লামিন ইয়ামাল।’ প্রতিদিন হাজারো ছবি তোলেন একজন ফটোগ্রাফার, প্রায় সবই ভুলে যান। কিন্তু কিছু ফ্রেম যেন সময়ের বাইরে বাস করে, অপেক্ষা করে নিজের গল্প বলার দিনের জন্য, ‘এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা ছিল লাখে একটা। এটা সত্যিই ভাগ্যের এক অলৌকিক খেলা।’

এখন সেই অলৌকিক গল্পই এসে দাঁড়িয়েছে বাস্তবতার চূড়ান্ত মঞ্চে। নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম, আগামী ১৯ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনাল, আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন। আটলান্টায় নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে আলবিসেলেস্তেরা। তার আগে ফ্রান্সকে হারিয়ে ১৬ বছরের প্রতীক্ষা ঘুচিয়ে ফাইনালে স্পেন। ইতালি-ব্রাজিলের পর টানা দুইবার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন আর্জেন্টিনার সামনে, আর ২০১০ সালের সেই সোনালি স্মৃতি ফেরানোর ডাক স্পেনের কণ্ঠে।

একদিকে ৩৯ বছর বয়সী মেসি, যার শরীরে হয়তো ক্লান্তি জমেছে, কিন্তু চোখে এখনো জ্বলছে শেষবারের মতো ইতিহাস গড়ার আগুন। অন্যদিকে ১৯ বছরের ইয়ামাল, যার সামনে খোলা পড়ে আছে গোটা ভবিষ্যৎ, অথচ এখন তাকে দাঁড়াতে হচ্ছে নিজের শৈশবের নায়কের বিপক্ষে। ১৭ বছর আগে যে গল্প আটকে ছিল একটা প্লাস্টিকের গামলা আর একটা ক্যামেরার ফ্রেমে, আজ সেই গল্পই ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবীর সামনে, বিশ্বকাপ ফাইনালে।

বাথটাবের সেই ছোট্ট শিশু আর তাকে কোলে নেওয়া সেই লাজুক তরুণ, দুজনেই আজ ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এবার আর ছবির গল্প নয়। এবার লেখা হবে মাঠের গল্প। রক্ত-মাংসের লড়াই, ঘামে ভেজা জার্সি আর ৯০ মিনিটের সেই শ্বাসরুদ্ধকর যুদ্ধ, যেখানে হয়তো শেষবারের মতো এক কিংবদন্তি আর তারই উত্তরসূরি মুখোমুখি দাঁড়াবেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্রফির মালিক হতে।