বৈধ গ্যাস না পেয়ে বাড়ছে চুরি

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৩ এএম

বৈধ গ্যাস না পেয়ে চুরি করছেন এক শ্রেণির গ্রাহক। কেবল আবাসিক নয়, বাণিজ্যিক এমনকি শিল্পপ্রতিষ্ঠানও চলছে চুরির গ্যাসে। বছরজুড়ে এমন শত নয়, হাজার নয়, লাখ লাখ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেও চুরি থামানো যাচ্ছে না। দেশের অন্য বিতরণ কোম্পানিতে চুরির হার কম হলেও তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে চলছে লাগামহীন চুরি।

তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, তারা প্রতি মাসেই হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। কিন্তু কোনোভাবেই অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না। অবৈধ সংযোগ কেটে আসার পর কেউ না কেউ তা ফের জুড়ে দিচ্ছে। প্রত্যেকটি বাড়িতে তো রোজ যাওয়া সম্ভব নয়। সেই লোকবল আর ব্যবস্থাও নেই। সরকার প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। তাদের মতে, অন্তত অবৈধভাবে যারা ব্যবহার করছে তাদের বৈধ করা গেলেও গ্যাস চুরি কমত। তাদের মতে, এই অবৈধ ব্যবহারকারীরা গ্যাস তো ব্যবহার করছেনই, তাহলে সেই রাজস্ব আদায় করলে সমস্যা কোথায়।

সবচেয়ে বেশি গ্যাস চুরি হচ্ছে আবাসিক খাতে। গত দুই অর্থবছরে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে ২৪ থেকে ২৬ ভাগ গ্যাস চুরি হয়েছে। এক বছরের তুলনায় পরের বছর চুরির হার আরও বাড়ছে। এক শ্রেণির গ্রাহক গ্যাস চুরি করায় এর দায় গিয়ে পড়ছে সব শ্রেণির মানুষের ওপর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সব আবাসিক সংযোগ বন্ধ রয়েছে। নতুন করে আর আবাসিক গ্যাস দেওয়া তো দূরের কথা, পুরনো সংযোগও কেটে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আবার গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহককে গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের ডিমান্ড নোট দিয়ে রেখেছে। সরকার আসলে কী করতে চায়, সে বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা আসা উচিত বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তিতাসে অবৈধ সংযোগ আসলে কত! : তিতাস বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অভিযান চালিয়ে ৪১৯ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন অপসারণ করা হয়। অবৈধ সংযোগের কারণে গৃহস্থালির ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৭৯টি গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারের কারণে ১১০টি শিল্প, ১৮৬টি বাণিজ্যিক, ৫৪টি ক্যাপটিভ এবং চারটি সিএনজি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। বিপুল পরিমাণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর যে কেউ মনে করতে পারেন, আর অবৈধ সংযোগ নেই। কিন্তু এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার কোম্পানিটি ২০৬টি মোবাইল কোর্ট এবং ৩৭২টি কোম্পানির নিজস্ব অভিযানে উৎসমুখ চিহ্নিত ১ হাজার ২৬৭টি পয়েন্টে প্রায় ২১০ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে।

ওই বছর ১ লাখ ৬ হাজার ৪৫৯টি বার্নারের অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ওই সময়ে নানা অনিয়মের কারণে ৩৪১টি শিল্প, ৭৩টি ক্যাপটিভ, ১৫১টি বাণিজ্যিক ও ১১টি সিএনজি গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এখানেই যদি অবৈধ ব্যবহারকারীদের নিবৃত্ত করা যেত, তাহলে মন্দ হতো না।

কিন্তু গত মে মাসে দেখা যায়, তিতাস ১৬ হাজার অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। এর ঠিক আগের মাস এপ্রিলে ১২ হাজার ৭৮৯টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। এভাবে প্রতি মাসেই ১০ থেকে ২০ হাজার অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। এরপরও অবৈধ ব্যবহারকারীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিতাস নিজেও বলতে পারে না তাদের কত অবৈধ ব্যবহারকারী রয়েছে। তিতাসের অভিযানগুলোর চিত্র দেখে মনে হয়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুরে অবৈধ ব্যবহারকারী বেশি রয়েছেন।

আবাসিকে বিপুল গ্যাস চুরি : দিন গড়াচ্ছে আর চুরির পরিমাণ বাড়ছে। অন্য খাতে কম থাকলেও আবাসিকে সীমাহীন গ্যাস চুরি হচ্ছে। গত পাঁচ অর্থবছরের তুলনামূলক চিত্র বলছে, এখন প্রতিদিন অন্তত তিতাস এলাকার গৃহস্থালিতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস চুরি হচ্ছে।

তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গৃহস্থালিতে ২ হাজার ৪০১.০২ মিলিয়ন ঘনমিটার (এমএমসিএম) গ্যাস কিনেছে। এর বিপরীতে তারা বিক্রি করে বিল পেয়েছে ১ হাজার ৭৬৬.৮৫ এমএমসিএম গ্যাসের। অর্থাৎ ক্রয় এবং বিক্রয়ের মধ্যে ৬৩৪.১৭ এমএমসিএম পার্থক্য রয়েছে। এতে বার্ষিক হিসেবে এই সিস্টেম লসের পরিমাণ ২৬.৪১ ভাগ বলছে তিতাস। আসলে এই পুরো গ্যাসই চুরি হচ্ছে।

একইভাবে যদি দেখা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তিতাস গৃহস্থালিতে ২ হাজার ৪২৪.৩৪ এমএমসিএম গ্যাস কিনেছে। এর বিপরীতে বিক্রি করেছে ১ হাজার ৮২২.১৭ এমএমসিএম। অর্থাৎ সেখানেও পার্থক্য বছরে ৬০২.১৭ এমএমসিএম। ওই বছর তিতাসের গৃহস্থালিতে সিস্টেম লসের পরিমাণ ছিল ২৪.৮৩ ভাগ।

২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হওয়ায় তিতাস এখনো এই হিসাব বের করেনি। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩ ভাগ গৃহস্থালির সিস্টেম লস ছিল। কিন্তু এরপর ধারাবাহিকভাবে তা বেড়ে যায়।

২০ লাখ নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব : সর্বশেষ হিসাবে গৃহস্থালিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্রয় এবং বিক্রয়ের পরিমাণের পার্থক্য দেখানো হয়েছে ৬৩৪.১৭ এমএমসিএম। এই গ্যাসকে ৩৬৫ দিয়ে ভাগ করলে প্রতিদিন গড়ে হিসাব দাঁড়ায় ১.৭৪ এমএমসিএম।

তিতাসের হিসাবে, একটি চুলা মাসে গ্যাস ব্যবহার করে ২৬ ঘনমিটার। অর্থাৎ দৈনিক হিসেবে একটি চুলা গ্যাস ব্যবহার করে প্রায় ০.৮৬৭ ঘনমিটার। এই হিসাবে দেখা যায়, চুরি যাওয়া গ্যাস দিয়ে ২০ লাখ ডাবল বার্নার গ্যাসের চুলা জ¦লতে পারে।

অর্থাৎ সরকার যদি নতুন গ্যাসের সংস্থান না করেই আগে থেকে ব্যবহার করছে এমন ২০ লাখ গ্রাহককে বৈধ করতে পারে।

কী পরিমাণ রাজস্ব আদায় বাড়বে : একটি ডাবল বার্নার গ্যাসের চুলায় প্রতি মাসে বিল দেওয়া হয় ১ হাজার ৮০ টাকা। সেই হিসাবে ২০ লাখ নতুন গ্রাহক পাওয়া গেলে মাসে ২১৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব। বছরে যা গিয়ে দাঁড়াবে ২ হাজার ৫৯২ কোটি টাকায়।

কেবল সরকারের একটি সিদ্ধান্তেই এই পরিমাণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেতে পারে তিতাস এলাকায়। সবগুলো গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে অবৈধ ব্যবহারকারীদের বৈধ করা সম্ভব হলে এই আয় আরও বাড়তে পারে।

জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের বৈধ করার সময় যদি অবৈধ ব্যবহারের জন্য ৫ থেকে ৭ বছরের জরিমানা আদায় করা হয়, তাহলে একবারে রাজস্ব আদায় হতে পারে ১২ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা থেকে ১৮ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে অন্তত তিনটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু এটা না করে আমরা গ্যাস দিচ্ছি, কিন্তু কোনো বিল নিচ্ছি না।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার এভাবে একবার অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের সংযোগ বৈধ করেছিল। তখনো জরিমানা নিয়ে ব্যবহারকারীদের সংযোগ বৈধ করা হয়। তখন কয়েক লাখ গ্রাহককে বৈধ করা হয়েছিল।

কিন্তু দীর্ঘদিন এভাবে গ্যাস চুরির সুযোগ করে দেওয়ার সঙ্গে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও জড়িত বলে মনে করা হয়।

নতুন গ্যাসের চাহিদা তৈরি হলেও মেটানো সম্ভব : পৃথিবীর বহু দেশ বড় পরিসরের বদলে ছোট পরিসরে এলএনজি আমদানি করে। একে স্মলস্কেল এলএনজি বলা হয়ে থাকে। ১ হাজার থেকে ১০ হাজার ঘনমিটারের ছোট ছোট ক্যারিয়ারে করে এলএনজি আনা যায়। খানিকটা দামি হলেও পৃথিবীর অনেক দেশ স্মলস্কেল এলএনজি এনে ব্যবহার করে। এ ধরনের এলএনজি আনার জন্য প্রাথমিক ব্যয় অনেক কম। বাংলাদেশে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি আমদানি করে। এর সঙ্গে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিকে যদি সরাসরি এলএনজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে এ ধরনের প্রকল্প সফল করা সম্ভব।

কী বলছে তিতাস : প্রতি বছর আবাসিকে প্রায় ২৬ ভাগ গ্যাসে সিস্টেম লস হচ্ছে উল্লেখ করে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেসব বাড়িতে গ্যাসের সংযোগ ছিল, কিন্তু নতুন করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই চুরি করে গ্যাস ব্যবহার করেন। আমরা তা বন্ধ করতে পারছি না। তিনি বলেন, আমরা বহুবার বলেছি, এদের অন্তত গ্যাসের লাইনটা বৈধ করে দেওয়া হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত