সবাইকে ছাড়িয়ে মেসি

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৩ এএম

লোকেরা বলে, প্রথম প্রেমের স্বাদ নাকি মানুষ কখনো ভোলে না। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সে এসে কেউ যদি নতুন করে প্রেমে পড়ে? ২০২৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের এই ম্যাজিক্যাল রাতটি যারা দেখল, তারা আজীবন নিজেদের ভাগ্যবান ভাববে। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসের ওপর যখন শেষ বাঁশি বাজল, তখন আর এক ফোঁটা শক্তি অবশিষ্ট নেই লিওনেল মেসির শরীরে। হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাতে মুখ ঢাকলেন মহাতারকা। কোনো গোল করেননি, কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক হৃদয়ের প্রদর্শনী দিয়ে গেলেন। ৩৯ বছরের এক ‘বুড়ো’ জাদুকর তার ফুটবল মস্তিষ্ক আর ঈশ্বরের বাঁ পায়ের (এবং এদিন ডান পায়ের!) তুলিতে এঁকে দিলেন এক মহাকাব্য, যার শেষ লাইনে লেখা আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে!

ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়লেন মেসি। প্রথম অধিনায়ক হিসেবে দুবার সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার হাতছানি এখন তার সামনে। আর এই সবকিছু তিনি করছেন ৩৯ বছর বয়সে, পুরো দলকে নিজের চওড়া কাঁধে টেনে নিয়ে।

ম্যাচটি শুরুর আগে থেকেই বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল এক তীব্র, দমবন্ধ করা উত্তেজনায়। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড; এই লড়াই তো কেবল বাইশটা পায়ের ফুটবল ম্যাচ নয়। এর পরতে পরতে মিশে আছে ১৯৮৬-র ম্যারাডোনার ঈশ্বরীয় প্রতিশোধ, ফকল্যান্ড যুদ্ধের দীর্ঘশ্বাস আর দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর রাজনৈতিক ক্ষত।

রণক্ষেত্রের মতোই শুরু হয়েছিল প্রথমার্ধ। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন মরুময়, রুক্ষ আর গোলশূন্য প্রথমার্ধ আর দেখা যায়নি। মাঠের লড়াই রূপ নিয়েছিল কুস্তি আর ফুটবলের এক অদ্ভুত মিশ্রণে। মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল আর লিয়ান্দ্রো পারেদেসের সঙ্গে জুড বেলিংহামের অনবরত কড়া ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছিল প্রতি মুহূর্তে। গ্যালারিতে বসে থাকা প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক মার্টিন ইদাবেরি তার নোটবুকে লিখছিলেন,‘সব উত্তেজনা মাঠের খেলায় এসে বিস্ফোরিত হলো। ম্যাচের প্রথম আধা ঘণ্টায় পারেদেস-বেলিংহামের দ্বন্দ্বই ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রে। প্রথমার্ধের ৪৫ মিনিট কেটেছে ট্যাকল, ফাউল আর গালাগালির মধ্য দিয়ে। অসাধারণ! সত্যি বলতে, তারা কেউ কাউকে এক চুল ছাড় দেয়নি।’

মেক্সিকান লেখক ফেদেরিকো গুজমান রুবিও গ্যালারির এই আদিম হিংস্রতা দেখে মুগ্ধ হয়ে বিড়বিড় করছিলেন, ‘আমি ভাবতাম আর্জেন্টাইনরা ছোটগল্প লেখায় সবচেয়ে সেরা; আমি ভুল ছিলাম। আসলে ওরা সেরা মহাকাব্য বা ‘এপিক’ রচনায়।’

এই মহাকাব্যের মূল চরিত্র তখন শান্ত চোখে পুরো ছকটা দেখছিলেন। প্রথমার্ধে মেসি ১৫ বার বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন। বয়স তার শরীর থেকে গতি কেড়ে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার মস্তিষ্ক তখনো সবার চেয়ে ১০ সেকেন্ড এগিয়ে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম স্তব্ধ। মলিনার আগেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হ্যারিসন রিড গোল করে এগিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডকে। ১-০! ইংলিশ গ্যালারিতে তখন উৎসবের দামামা। ঠিক তখনই ইংল্যান্ডের ডাগআউটে বদল আনলেন থমাস টাচেল। গোল ধরে রাখার জন্য রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নিয়ে মাঠ থেকে তুলে নিলেন তিনজন আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কে। সাবেক বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি ক্যাসপারভ মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠলেন, ‘ইংল্যান্ডের এই গোল করার পর গুটিয়ে যাওয়াটা ছিল ঠিক দাবার বোর্ডে একটা বোড়ে  জিতেই মিখাইল তালের মতো আগ্রাসী খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে অল-আউট প্যাসিভ ডিফেন্স খেলতে যাওয়ার মতো চরম ভুল।’

১-০ তে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা যখন খাদের কিনারে, তখন দৃশ্যপটে হাজির হলেন সেই ‘পুলগা’। লিয়ান্দ্রো পারেদেস মাঠ থেকে উঠে যাওয়ার পর মেসিকে ডান প্রান্তে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ করে দেন স্ক্যালোনি। আর তাতেই খুলে গেল জাদুর বাক্স।

একের পর এক বিষাক্ত ড্রিবলিংয়ে তিনি ইংলিশ ডিফেন্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ফাউল করতে বাধ্য করলেন, আদায় করলেন হলুদ কার্ড। ২০ বছরের তরুণের মতো এঁকেবেঁকে ঢুকে বল বাড়াতে লাগলেন সতীর্থদের দিকে।

টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই দৃশ্য দেখছিলেন মেসির সাবেক গুরু পেপ গার্দিওলা। ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত পেপ বলেন, ‘লোকেরা আমাকে জিজ্ঞেস করে ৩৯ বছর বয়সেও মেসি কীভাবে এটা করে যাচ্ছে। আমার উত্তর সহজ : ফুটবলের ইতিহাসে ওর মতো কেউ কখনো আসেনি। বয়স সবাইকে হারায়, কিন্তু লিওনেল মেসিকে হারাতে ও যেন অস্বীকৃতি জানায়। ও নিজে এখন আর আগের মতো দৌড়ায় না, কিন্তু বাকি সবাইকে নিজের জন্য দৌড়াতে বাধ্য করে। ও ফুটবল ইতিহাস লিখেই চলেছে। ও এই স্তরে টিকে নেই, ও রাজত্ব করছে।’

ম্যাচ শেষ হতে তখন আর মাত্র ৭ মিনিট বাকি। টানটান উত্তেজনা। ঠিক তখনই মেসির পা থেকে বের হলো সেই অতিপ্রাকৃতিক নিখুঁত পাস। দুজনকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে ফাঁকায় বল বাড়িয়ে দিলেন এনজো ফার্নান্দেজকে। এনজোর দুর্দান্ত ডান পায়ের শটে সমতায় ফিরল আর্জেন্টিনা (১-১)!

কিন্তু মেসি নামের মহাবিস্ফোরণ তখনো বাকি ছিল। ম্যাচের ঠিক শেষ মুহূর্তে নিজের ‘ব্লাইন্ড সাইড’ দিয়ে ছিটকে বের হয়ে গেলেন তিনি। প্রতিপক্ষের ২১ ও ২৫ বছরের ডিফেন্ডারদের স্রেফ কোমরের দোলা দিয়ে বোকা বানিয়ে, ডান পায়ে আলতো করে বলটি ভাসিয়ে দিলেন লাউতারো মার্টিনেজের মাথায়। নিখুঁত হেড! গোল! ২-১!

মাত্র সাত মিনিটে ম্যাচের ভাগ্য সম্পূর্ণ বদলে গেল। ধারাভাষ্যকার এদুয়ার্দো ভারেলা তখন চিৎকার করে কাঁদছেন। বদলি বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে মুঠো পাকিয়ে গর্জন করছেন মেসি। ম্যাচ শেষে বিধ্বস্ত অবস্থায় মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন, ‘এই পুরো সপ্তাহজুড়ে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মেসিকে আটকানো। আমরা ভেবেছিলাম আমরা সফল হয়েছি, ওকে গোল করতে দিইনি। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সেও ও যা করল... মাত্র দুটো অ্যাসিস্ট, দুটো জাদুকরী মুহূর্ত আর ম্যাচটা আমাদের হাত থেকে কেড়ে নিল।’

বিজয়ীর শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যামেরা খুঁজে নিল লিওনেল মেসিকে। এনজো ফার্নান্দেজ তাকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন, গ্যালারিতে তখন লাখো মানুষের কান্নার রোল। এই মেসি যেন ১৯৮৬-র ম্যারাডোনা আর ১৯৫৮-র পেলের এক অদ্ভুত পুনর্জন্ম। স্প্যানিশ স্পোর্টস ডেইলি ‘এল পাইস’ তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে : সুইজারল্যান্ডের ম্যাচের মতোই তিনি গোল করেননি, কিন্তু লাউতারোকে দিয়ে গোল করিয়ে ৩৯ বছর বয়সেও প্রমাণ করলেন তিনি চিরন্তন।

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের ধারাভাষ্যকাররা পর্যন্ত আজ নতমস্তকে কুর্নিশ করছেন এই আর্জেন্টাইন স্পিরিটকে। ব্রাজিলিয়ান ধারাভাষ্যকার গুগা চাকরা গ্যালারিতে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিখেছেন, ‘আর্জেন্টাইনদের প্রতি আমার একই সঙ্গে হিংসা এবং গভীর শ্রদ্ধা হচ্ছে। ওদের জয়ের এই অদম্য জেদ আমাদের ব্রাজিল দলে নেই। আমরা যখন নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছি, তখন আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য কামব্যাকে ফাইনালে চলে গেল।’

তবে এই জয়ের সবচেয়ে মানবিক আর কান্নার রূপটি ফুটে উঠল ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রবীণ সৈনিক ও বর্তমান টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ওমর দে ফিলিপ্পের কণ্ঠে। ম্যাচ শেষে চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘কিছু ম্যাচ ফুটবলকে ছাপিয়ে যায়। মালভিনাস (ফকল্যান্ড) যুদ্ধের একজন প্রবীণ সৈনিক হিসেবে আমি আজ এই ছেলেদের ধন্যবাদ জানাতে চাই এই অপার আনন্দের জন্য। খেলাধুলা হয়তো ইতিহাস বদলাতে পারে না, কিন্তু এটি এমন কিছু ক্ষত উপশম করতে সাহায্য করে যা এখনো আমাদের হৃদয়ে ভীষণভাবে তাজা।’

এই জয় আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে মেসিকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়, যেখানে তিনি আর সাধারণ কোনো মানুষ নন, এক জীবন্ত ঈশ্বর।

আগামী রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে সেই ঐতিহাসিক ফাইনাল। সেখানে মেসির মুখোমুখি হবে সেই ‘শিশু’ লামিন ইয়ামাল, যাকে বহু বছর আগে বার্সেলোনায় এক ফটোশুটের সময় নিজের কোলে নিয়ে পরম স্নেহে স্নান করিয়েছিলেন মেসি। সেই ছেলেটিই মেসির ‘লাস্ট ড্যান্স’ বা শেষ নৃত্যের শেষ বাধা। তবে আর্জেন্টাইনদের কাছে রবিবারের ম্যাচের হিসাব বড় সহজ। আর্জেন্টিনার লেখিকা ও সাহিত্য সমালোচক ভ্যালেরিয়া কাস্তেলো-জুবার্ট তার ডায়েরিতে শেষ লাইনে যা লিখেছেন, তা প্রতিটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের মনের কথা, ‘আসল ফাইনাল তো আজই হয়ে গেল ইংল্যান্ডকে হারানো। রবিবারের ম্যাচটা তো কেবল প্রথম স্থান নির্ধারণের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।’

ফুটবলের কাছে যার আর কোনো ঋণ শোধ করার বাকি নেই, রবিবারের মেটলাইফ স্টেডিয়াম এখন কেবলই সেই অমর জাদুকরের রাজকীয় বিদায়ের শেষ তুলির আঁচড়ের অপেক্ষায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত