হাসিনাকে প্রত্যর্পণে সাড়া নেই থমকে গেছে কূটনৈতিক চেষ্টা

জুলাই হত্যা মামলায় ফাঁসির দ- পাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিসেম্বরে দেশে ফেরা’র ঘোষণা নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ। বিএনপিসহ মাঠে সক্রিয় দলগুলোর পক্ষ থেকে আসছে বিভিন্ন বক্তব্য। শেখ হাসিনার বক্তব্য স্রেফ রাজনৈতিক কৌশল কি না তা নিয়েও বিতর্ক আছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম মনে করেন, ভারতে নির্বাসনে থাকার কারণে শেখ হাসিনার পক্ষে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। তার ফেরার বিষয়টি নির্ভর করছে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারত সরকারের সাড়া দেওয়ার ওপর। সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে দিল্লি। দেশে পাঠানোর পর সরাসরি তাকে কারাগারে যেতে হবে। সরকারের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক মন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্যেও একই কথা বলা হচ্ছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে এমন আশা সরকার অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকেও বিষয়টি নিয়ে হাল ছেড়ে দেয় ঢাকা। এখন বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে দুই দেশের রাজনৈতিক সমঝোতা এবং শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের ওপর। কূটনৈতিক পথে এর কোনো সুরাহা হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।         

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিনেই একটি সামরিক পরিবহন বিমানে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাকে দেশে ফেরত আনতে দিল্লিকে কয়েক দফা চিঠি দেয় ঢাকা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ হয়েছে। তবে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে দিল্লির কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত বছরের ডিসেম্বর এনডিটিভিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। জয়শঙ্করকে প্রশ্ন করা হয়, শেখ হাসিনা কি যত দিন ইচ্ছা তত দিন ভারতে থাকতে পারবেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘তিনি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এখানে এসেছেন। আমার মনে হয়, সেই পরিস্থিতিই ভবিষ্যতে তার জন্য কী হবে সেটা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা তাকেই নিতে হবে।’

‘দেশে ফেরা’ নিয়ে রয়টার্সকে দেওয়া শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে জল্পনা-কল্পনার মধ্যে সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেছে। সেখানে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান, এই বিষয়টিতে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। যেকোনো প্রত্যর্পণ একটি আইনি বিষয়, সে অনুযায়ী এর নিষ্পত্তি করা হবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ইস্যুতে ভারতের মনোভাব আগের মতোই আছে। দুই দেশের মধ্যে পলাতক আসামিদের দ্রুত এবং সহজে বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশ ও ভারত ২০১৩ সালে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি সই করে। ২০১৬ সালে এটি সংশোধন করা হয়। চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে বন্দি বিনিময় প্রক্রিয়া সহজ করলেও এর কিছু ধারা শেখ হাসিনাকে ফেরানোর পথে জটিলতা তৈরি করেছে।

দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী বন্দি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে দ্বৈত অপরাধের নীতি প্রযোজ্য হতে হবে, অর্থাৎ অপরাধটি উভয় দেশে শাস্তিযোগ্য হতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো, যাকে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগটি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতি’র হয়ে থাকলে যেকোনো দেশ সেই অনুরোধ খারিজ করতে পারবে। শেখ হাসিনা ইস্যুতে এই ধারাগুলোকেই সামনে রেখে কূটনৈতিক ভাষায় ‘আইন অনুযায়ী’ চলার কথা বলছে ভারত। ফলে দিল্লি শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফেরত দেবে এমন আশা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকার একাধিকবার ভারতে চিঠি চালাচালি করেছে। অনানুষ্ঠানিক আলোচনাতেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তবে কখনোই ভারত সরকারের সাড়া মেলেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খুব পরিষ্কার ভাষায় বললে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে দিল্লি অসহযোগিতা করেছে। তাই বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের হাতে নেই বললেই চলে। ভারত সরকার আগ্রহী হলে এবং শেখ হাসিনা নিজে ফিরে আসতে চাইলেই কেবল বিষয়টি ঘটা সম্ভব। এর বাইরে কোনো সুযোগ নেই। আবার শেখ হাসিনা ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি হওয়ায় দুই দেশের রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চাইবেন কি না সেটিও বড় প্রশ্ন।’

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের একজন নাগরিক তার দেশে ফিরবেন এটি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এক্ষেত্রে সরকারের বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকার অপেক্ষা করছে।’

সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তিনি ডিসেম্বরে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরবেন। তবে গত বছরের জানুয়ারিতে তার পাসপোর্ট বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, এ অবস্থায় দেশে ফিরতে চাইলে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনে তাকে ট্রাভেল পাসের আবেদন করতে হবে। সেই পাস দেওয়া হবে কি না সেটি নির্ভর করে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার কী করবে সে বিষয়ে পরিষ্কার জবাব দেননি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে কূটনীতিক প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই, সেটা আগেই জানিয়েছি।’ 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল যে অবস্থান জানিয়েছেন সেটি আসলে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ঝুঁলিয়ে রাখা। দেশটির পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়েছে, তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না। শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা বা ফিরিয়ে নিয়ে আসার বিষয়টি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার ওপরও নির্ভর করে। কারণ তিনি দ-প্রাপ্ত আসামি। ফলে এই ইস্যুতে অনেকগুলো প্রশ্ন আছে। আছে রাজনৈতিক ব্যাপারও। এখনই কিছু বলা যাবে না, ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’        

একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশে ফিরতে চান। এখানে আইন বাধা কেন হবে? তবে এক্ষেত্রে কূটনীতিক ও রাজনৈতিক কিন্তু থাকতে পারে।’