সংবাদমাধমে প্রকাশ, হবিগঞ্জের মাধবপুরে সড়কের পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে যাওয়া এক নবজাতক কন্যাশিশুকে উদ্ধারের পর তার মা-বাবাকেও খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। জানা যায়, চরম দারিদ্র্যের কারণে ওই দম্পতি শিশুটিকে ফেলে গিয়েছিল এবং শিশুর ভরণপোষণের সামর্থ্য না থাকায় এখনো তারা চায়, শিশুটিকে কেউ দত্তক নিয়ে নিক। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন শিশুটিকে এক নিঃসন্তান দম্পতির জিম্মায় হস্তান্তর করেছে। অবশ্য এর আগে শিশুটির মা-বাবার কাছ থেকে তারা এই মর্মে হলফনামায় স্বাক্ষর নেয় যে, ‘ভবিষ্যতে তারা শিশুটির কোনো পরিচয় দেবেন না এবং তার ওপর কোনো দাবি-দাওয়া রাখবেন না’।
এর পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়েছে অনেক প্রশ্ন। যেমনউপজেলা প্রশাসন শিশুটিকে যত উৎসাহ নিয়ে দত্তকদানের ব্যবস্থা করেছে, সে তুলনায় ওই দরিদ্র বাবা-মায়ের আয়-সংস্থানের জন্য ন্যূনতম কোনো উদ্যোগ কি নিয়েছে, যাতে ওই শিশুটিকে দত্তক না দিয়ে বাবা-মায়ের কাছেই রেখে দেওয়া যায়? দেশে নাকি বহু বছর ধরেই দরিদ্রভাতা চালু আছে। শিশুটির লালন-পালন ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন বেশ উৎসাহের সঙ্গেই শিশুটিকে দত্তক নিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। পরিত্যক্ত শিশুর বাবা-মার সন্ধান পাওয়া না গেলেই কেবল এ জাতীয় একটি শিশুকে নিরাপদ হেফাজতে অন্যের অভিভাবকত্বে ন্যস্ত করা যায় দত্তক হিসেবে নয়? এ ক্ষেত্রে শিশুর বাবা-মাকে যেহেতু খুঁজে পাওয়া গেছে, সেহেতু উপজেলা প্রশাসনের প্রথম ও একমাত্র কর্তব্য ছিল শিশুটিকে তার বাবা-মায়ের কাছে হস্তান্তর করা। আর শিশুটির লালন-পালনের সামর্থ্য বাবা-মায়ের না থাকলে তাদের জন্য আয়-সংস্থানের দায়িত্বও রাষ্ট্রের তথা এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে... কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার।’ সে ক্ষেত্রে ওই শিশুর বাবা-মায়ের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে তাকে ‘দত্তকগ্রহীতা’র কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন সংবিধান ও আইন দুটোই লঙ্ঘন করেছে।
এখন কেউ যদি তাদের বিরুদ্ধে আইন ও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে আদালতের শরণাপন্ন হন, তারা এর কী জবাব দেবেন? উপজেলা প্রশাসন শিশুটিকে তথাকথিত দত্তকগ্রহীতার কাছে হস্তান্তরের আগে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে এই মর্মে লিখিত অঙ্গীকার নিয়েছে যে, ‘ভবিষ্যতে তারা শিশুটির বাবা-মা হিসেবে কোনো পরিচয় দেবেন না’। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষমতাহীন ওই দরিদ্র বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাদের অসহায়ত্বের সুযোগে এরূপ অঙ্গীকার নেওয়াটা মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ সন্তানের ওপর বাবা-মায়ের অধিকারই সর্বাগ্রগণ্য। ফলে বাবা-মা হয়েও এ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না এটি নৈতিকতা ও মানবাধিকার উভয় মানদণ্ডেই অগ্রহণযোগ্য। তারচেয়েও বড় কথা, শিশু দত্তক দেওয়া বা নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশে কোনো আইন নেই। আর যেহেতু আইন নেই, সেহেতু আইনগত অধিকারবিহীন কিছু করাটাই আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু জনসেবকরা এ বিষয়গুলো কি জানেন, নাকি জেনেও ক্ষমতার আত্মম্ভরিতায় আইন ভঙ্গ করছেন? উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আইনে শিশুর অভিভাবকত্ব গ্রহণের একটি বিধান আছে। তবে সেখানে দত্তক নেওয়া বা দেওয়ার বিধান নেই। তা ছাড়া অভিভাবকত্ব গ্রহণ সংক্রান্ত ওই বিধানের আওতায় পিতৃ-মাতৃত্ব দাবি করারও কোনো সুযোগ নেই। তদুপরি মুসলিম আইনেও সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো বিধান নেই।
শিশুটির প্রতি তথাকথিত মমতা প্রদর্শনের লক্ষ্যে স্থানীয় প্রশাসন প্রচলিত আইন ভঙ্গ করে প্রাণপণে দত্তকগ্রহীতা খুঁজে বেরিয়েছে। কিন্তু তারা একবারের জন্যও কি এমন কাউকে খুঁজেছেন, যারা ওই শিশুর দরিদ্র বাবা-মায়ের আয় বা কর্মসংস্থানের দায়িত্ব নিতে রাজি আছেন? না, তারা তা খোঁজেননি। অথচ সেটিই করা দরকার ছিল সবার আগে এবং তা করা হলে শিশুটি যেমন তার বাবা-মায়ের কাছে থাকার প্রাকৃতিক অধিকারটুকু ফিরে পেত, তেমনি বাবা-মাও একটি স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনের ভেতরে থেকে শিশুটিকে আপন মমতায় বড় করে তুলতে পারতেন। ওই দম্পতির আগে থেকেই আরও দুটি সন্তান রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন তথা সেখানকার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর প্রধানকে জিজ্ঞেস করি, ওই দম্পতির দুটো সন্তান থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় সন্তান না নেওয়ার ব্যাপারে ওই দম্পতিকে কি কোনো পরামর্শ দিয়েছিলেন কিংবা এ ব্যাপারে কোনো ধরনের উপকরণ সহায়তা তাদের নাগাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল? আপনার দপ্তরের কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর কি কষ্মিণকালেও কোনো দিন ওই দম্পতির সঙ্গে দেখা হয়েছে? হয়নি। হলে আজ প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ১২ শতাংশের ওপরে আটকে থাকত না।
রাষ্ট্রের জনসেবকদের এ ধরনের অমানবিক জনসেবার উদাহরণের তালিকা এত দীর্ঘ যে, এরূপ নিবন্ধ লিখে তা বন্ধ করা যাবে না। তবু একটি নিষ্পাপ নবজাতক ও তার অসহায় বাবা-মায়ের করুণ অবস্থার কথা জেনে এবং এর বিপরীতে রাষ্ট্রের নির্দয়-নিষ্ঠুর আচরণ দেখে নিশ্চুপ হয়ে
থাকতে না পারাজনিত প্রতিক্রিয়া থেকেই এ লেখা। অবশ্য রাষ্ট্র ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি রাতারাতি পাল্টে যাবে এমনটি মনে করার কারণ নেই। কিন্তু এরপরও আশা করব, মাধবপুর উপজেলা প্রশাসন অবিলম্বে শিশুটিকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফেরত দেবে। সমাজের কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি ওই পরিবারটির জন্য কর্মের কোনো সংস্থান করে দেবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে আরও সক্রিয় হবে এবং জনপ্রশানের সেবকরা এ ধরনের ঘটনায় যতটা সম্ভব মানবিক, আইনানুগ ও সংবিধান অনুগামী হওয়ার চেষ্টা করবেন। যারা আইন-সংবিধান-নিয়মনীতির প্রতিপালক তারা যদি এর ব্যত্যয় ঘটান তাহলে সাধারণ মানুষের গত্যন্তরটা কী! মাধবপুরের ঘটনাটি খতিয়ে দেখে করা হোক যথাযথ প্রতিবিধান। মানবাধিকারের লঙ্ঘন মেনে নেওয়া যায় না।
লেখক : সাবেক পরিচালক, বিসিক
atkhan56@gmail.com