১৪ জুলাই দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল জীবনের পরিধি যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-মেইলের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারকরাও বদলে ফেলছে তাদের কৌশল। পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে, ভুয়া লিংক পাঠিয়ে কিংবা জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের টাকা ও ব্যক্তিগত তথ্য। পরিচয় প্ল্যাটফর্ম : নাগরিকের তথ্য কার নিয়ন্ত্রণে, রাষ্ট্রের নাকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের? বর্তমান যুগে আমাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজই ডিজিটালাইজড বা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। একটি ব্যাংক হিসাব খোলা থেকে শুরু করে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট খোলা, সবখানেই প্রযুক্তির ছোঁয়া। এমনকি নতুন একটি মোবাইল সিমকার্ড কিনতে গেলেও আমাদের ডিজিটাল ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। এই সবকিছুর মূলে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা হলো আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি।
বর্তমানে দেশে যেকোনো জরুরি বা সাধারণ সেবা পাওয়ার প্রধান শর্ত হলো এই জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা। এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি এখন আর কোনো কাগজের ফাইল বা সনাতন পদ্ধতিতে হয় না। এটি পুরোপুরি ডিজিটাল উপায়ে সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু এই ডিজিটাল যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি কীভাবে চলে, এর পেছনে কারা রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের তথ্যের নিরাপত্তা কতটুকু তা নিয়ে নাগরিক মনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি একই সঙ্গে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং তাৎক্ষণিক হতে হয়। কারণ, তথ্য যাচাই করতে যদি দিনের পর দিন সময় লেগে যায়, তবে ডিজিটাল সেবার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। এই জরুরি প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যেই ২০১৯ সালে বাংলাদেশে চালু করা হয়েছিল ‘পরিচয়’ নামের একটি বিশেষ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা। প্রযুক্তিগত ভাষায় একে বলা হয় ‘এপিআই-ভিত্তিক জাতীয় পরিচয় যাচাইকরণ প্ল্যাটফর্ম’। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ‘পরিচয়’ প্ল্যাটফর্মটি নিজে কিন্তু নাগরিকদের কোনো তথ্যের মালিক নয়। জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল তথ্যভা-ার বা ডাটাবেসটি রয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কাছে। ‘পরিচয়’ প্ল্যাটফর্মটি মূলত একটি ডিজিটাল সেতু বা ‘এপিআই গেটওয়ে’ হিসেবে কাজ করে। এটি একদিকে থাকে নির্বাচন কমিশনের মূল ডাটাবেসের সঙ্গে যুক্ত, আর অন্যদিকে থাকে বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আর্থিক লেনদেন ও রাজস্ব বণ্টন নিয়ে। কার পকেটে যাচ্ছে জনগণের টাকা? তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এই বিতর্কের জবাবে একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য ছিল, মূল এনআইডি ডাটাবেস কখনোই কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। ডাটাবেসের একমাত্র মালিক ও নিয়ন্ত্রক হলো বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। ‘পরিচয়’ প্ল্যাটফর্মটি কেবল একটি নিরাপদ কারিগরি সংযোগ পথ বা গেটওয়ে হিসেবে কাজ করেছে মাত্র। তাদের যুক্তি ছিল, একটি প্রযুক্তির অপারেশন পরিচালনা করা এবং সেই তথ্যের মালিক হওয়া দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সরকারি এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও জনমনে এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে বিতর্ক থামেনি। কারণ, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় হচ্ছে, তার হিসাব এবং বণ্টন প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছিল। ‘পরিচয়’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতিবার যখন কোনো নাগরিকের তথ্য যাচাই করা হয়, তখন তার বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি বা চার্জ আদায় করা হয়। বিভিন্ন তথ্যসূত্র ও তদন্ত থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে এই প্ল্যাটফর্মটি চালু হওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পরিচয় যাচাইয়ের খাত থেকে মোট রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ১১২ কোটি টাকা। কিন্তু আপত্তির জায়গাটি হলো, এই বিপুল আয়ের সিংহভাগই চলে গেছে বেসরকারি অপারেটর প্রতিষ্ঠান ওবিডিএল-এর কাছে। চুক্তি অনুযায়ী, মোট আয়ের শতকরা ৬০ ভাগ থেকে শুরু করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯০ ভাগ পর্যন্ত অর্থ ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি তুলে নিয়েছে। আর নামমাত্র অংশ জমা হয়েছে সরকারের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। এখানেই শেষ নয়, শুরুতে প্রতিবার পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ফি বা চার্জের পরিমাণ বেশ কম ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই ফি কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে বর্তমানে প্রতিটি ভেরিফিকেশনের জন্য প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মালিকানা এবং পরিচালনার দায়িত্ব এই দুটি বিষয়কে কাগজে-কলমে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে এর প্রভাব ছিল গভীর। যখন একটি মাত্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্যের প্রবেশদ্বারে বসে থাকে, তখন মালিকানা কার হাতে আছে তা সাধারণ মানুষের কাছে গৌণ হয়ে যায়। কারণ, তথ্যের ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারির ক্ষমতা সেই বেসরকারি অপারেটরের হাতেই থেকে যায় বলে নাগরিকের তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি এখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, এপিআই-ভিত্তিক যেকোনো প্ল্যাটফর্মে যদি সামান্যতম নিরাপত্তার দুর্বলতা বা কারিগরি ত্রুটি থাকে, তবে হ্যাকাররা খুব সহজেই সেখানে অননুমোদিত প্রবেশ বা অনুপ্রবেশ করতে পারে। এর ফলে তথ্য চুরি, তথ্যের অপব্যবহার কিংবা পরিচয় জালিয়াতির মতো মারাত্মক অপরাধ ঘটতে পারে। নির্বাচন কমিশনের মূল ডাটাবেসটি হয়তো সশরীরে নিরাপদ স্থানে আছে, কিন্তু যে পথ দিয়ে তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে, অর্থাৎ এই ‘পরিচয়’ গেটওয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই প্ল্যাটফর্মটি চালুর পর থেকে এর কোনো যথাযথ ‘এমআইএস অডিট’ বা স্বাধীন তথ্যপ্রযুক্তি নিরীক্ষা নিয়মিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনগণের মনে গভীর সন্দেহ ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে।
এই বিতর্কের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে, যা সরাসরি দেশের ‘তথ্য সার্বভৌমত্ব’ সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রশ্নটি হলো কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা বহুজাতিক কোম্পানি কি এই ‘পরিচয়’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করতে পারে? এই প্রশ্নের আইনি উত্তর হলো, সরকারের সরাসরি অনুমোদন এবং সুনির্দিষ্ট বৈধ চুক্তি ছাড়া কোনো বিদেশি কোম্পানি সরাসরি বাংলাদেশের এনআইডি ডাটাবেসে প্রবেশ করতে পারে না। তবে বাংলাদেশে কার্যরত বিভিন্ন বিদেশি বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান (যেমন বিদেশি ব্যাংক বা বহুজাতিক টেলিকম কোম্পানি) অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে এই দেশের নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের সেবা গ্রহণ করছে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়াটি নাগরিকের সম্মতির ভিত্তিতে হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য নিয়মিত তদারকি বা অডিট করা হয় কি না, তা জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট নয়। ফলে এটি আর কেবল একটি সাধারণ কারিগরি বিষয় বা সফটওয়্যার ব্যবহারের বিষয় থাকে না; এটি দেশের তথ্য সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা নীতি এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের এক বিশাল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।২০২৪ সালের দেশের বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই ‘পরিচয়’ প্ল্যাটফর্মের বিষয়টি নতুন করে আলোচনা ও পর্যালোচনার টেবিলে এসেছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আরও বেশি জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য ব্যাপক সংস্কারের প্রচেষ্টা চলছে, তখন জাতীয় পরিচয় যাচাইয়ের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাটির বর্তমান কাঠামোও নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এখন সময় এসেছে ‘পরিচয়’ প্ল্যাটফর্মের সামগ্রিক কারিগরি সক্ষমতা, এর আইনি ভিত্তি, পরিচালনা কাঠামো, আয়ের রাজস্ব বণ্টন ব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা এবং নাগরিকের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় এর ভূমিকা এই সবকিছুকে একটি স্বাধীন, উচ্চপর্যায়ের ও স্বচ্ছ তদন্ত বা পর্যালোচনার আওতায় নিয়ে আসা। যদি বর্তমান কাঠামোটি জনস্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়, তবে তাকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করা যেতে পারে। যদি নীতিগত ভুল, আইনি দুর্বলতা থাকে, তবে তা দ্রুত সংশোধন ও সংস্কার করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। ডিজিটাল বাংলাদেশ বা একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য কখনোই কেবল প্রযুক্তির অন্ধ ব্যবহার বা কিছু প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে দেশের সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তথ্যের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ। ‘পরিচয়’ প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও রহস্য তৈরি হয়েছে, সেটিকে ব্যক্তি বা কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের বিতর্ক হিসেবে না দেখে, এটিকে আমাদের দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও জনবান্ধব করার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
লেখক : প্রযুক্তিবিদ। অধ্যাপক, আইআইটি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
patwary@junivcom