ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তাগিদ

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে সত্য, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে পবিত্র কোরআন। ইসলাম মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ন্যায়বিচারকে অপরিহার্য নীতি হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই মুসলমানের ইমান, চরিত্র ও সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে ন্যায়পরায়ণতা গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট ভাষায় ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং যখন তোমরা মানুষের মাঝে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।’ (সুরা নিসা ৫৮)

আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে সাক্ষ্যদাতা হিসেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে, পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা নিসা ১৩৫)

এই নির্দেশ প্রমাণ করে, ইসলামে সত্য ও ন্যায়ের সামনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা কিংবা স্বার্থের কোনো মূল্য নেই। প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের ক্ষতি হলেও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে দ্বিধা করেন না।

ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে শত্রু-মিত্রের ভেদাভেদও ইসলাম গ্রহণ করে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের ন্যায়বিচার পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা ৮) অর্থাৎ বিরোধ, ঘৃণা কিংবা প্রতিশোধের মনোভাব কখনোই একজন মুসলমানকে অন্যায় করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও ন্যায়বিচারের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে বহু হাদিসে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ন্যায়পরায়ণ বিচারকরা কেয়ামতের দিন আল্লাহর নিকটে নুরের মিম্বরে থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম)

এটি তাদের জন্য এক মহাসুসংবাদ। অন্যদিকে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘জুলুম থেকে বেঁচে থাকো, কেননা জুলুম কেয়ামতের দিন অন্ধকারে পরিণত হবে।’ (সহিহ মুসলিম)

ন্যায়বিচার কেবল আদালত, প্রশাসন বা রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়। পারিবারিক জীবনে সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ এবং সামাজিক সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ন্যায়ের অনুশীলন অপরিহার্য। একজন মুসলমানের চরিত্রের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার ন্যায়পরায়ণ আচরণের মাধ্যমে।

ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো, এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে ওঠে। দুর্বলরা তাদের অধিকার ফিরে পায় এবং শক্তিশালীরাও সীমালঙ্ঘনের সাহস হারিয়ে ফেলে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক দিনের ন্যায়পরায়ণ শাসন ষাট বছরের নফল ইবাদতের চেয়েও উত্তম।’ (মুসনাদে আহমাদ)

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার