মানুষ বারবার ভুল করে। পাপে জড়ায়। তবুও ক্ষমার আশা শেষ হয় না। কারণ আল্লাহর রহমত মানুষের গুনাহের চেয়েও বিস্তৃত। তওবা করলে তিনি সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সুরা জুমার ৫৩)
এই চিরন্তন সত্য অনন্য শিল্পরূপে ফুটে উঠেছে পারস্যের বিখ্যাত কবি ওমর খৈয়ামের একটি রুবাইয়ে তথা চতুষ্পদী কবিতায়।
‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ কাব্যগ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘গার গওহারে তায়াতাত নুসুফতাম হারগেজ/ গার্দে গোনাহ আয চেহরে না রুফতাম হারগেজ/ নওমিদ নাইয়াম যে বারগাহে কারামাত/ যানরু কে ইয়াকি রা দো নাগোপতাম হারগেজ।’
অর্থাৎ আমি কখনোই ইবাদতের রতœ যথাযথভাবে অর্জন করতে পারিনি। পাপের ধুলোও কোনো দিন আমার মুখমণ্ডল থেকে দূর হয়নি। তবু আমি আপনার করুণা থেকে নিরাশ নই। কারণ আমি কখনো এককে দুই বলিনি।
মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো মহান আল্লাহর অসীম দয়া। ওমর খৈয়ামের এই বিখ্যাত কবিতা সেই আশ্রয়ের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এখানে কবি নিজের কোনো কৃতিত্বের কথা বলেননি। বরং অকপটে স্বীকার করেছেন, ইবাদতে তার ঘাটতি আছে, পাপ থেকেও তিনি মুক্ত নন। কিন্তু এই স্বীকারোক্তির মধ্যেও তিনি নিরাশ হননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, সত্যবাদিতার মূল্য আল্লাহর কাছে অপরিসীম।
কবিতার প্রথম দুই চরণে মানুষের আত্মসমালোচনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে। মানুষ সাধারণত নিজের ভালো কাজ প্রচার করতে ভালোবাসে এবং দুর্বলতা আড়াল করতে চায়। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে। সে বুঝতে শেখে, যত ইবাদতই করা হোক না কেন, আল্লাহর হক পুরোপুরি আদায় করা সম্ভব নয়। আবার পাপ থেকেও পুরোপুরি মুক্ত থাকা মানুষের পক্ষে কঠিন। এই উপলব্ধিই মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং তওবার পথে পরিচালিত করে।
তৃতীয় চরণে কবির অন্তরের গভীর ইমান প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন, এত ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ নন। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া বড় ধরনের ভ্রান্তি।
কবিতার শেষ চরণই এর মূল সৌন্দর্য। কবি বলেন, তিনি কখনো এককে দুই বলেননি। এই বাক্যটি কেবল সংখ্যার কথা নয়, বরং সত্যবাদিতার প্রতীক। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, জীবনে তিনি সত্যকে বিকৃত করেননি, প্রতারণাকে আশ্রয় দেননি এবং মিথ্যার মাধ্যমে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে করেননি। মানুষের অনেক গুণের মধ্যে সত্যবাদিতা এমন গুণ, যা সমাজে বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি করে।
ইসলামে সত্যবাদিতার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদাররা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তওবা ১১৯) হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদিতা মানুষকে সৎকর্মের দিকে নিয়ে যায়। আর সৎকর্ম জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি)। অর্থাৎ সত্যবাদিতা আখেরাতে মুক্তির অন্যতম মাধ্যম।
এই কবিতা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা কেবল বাহ্যিক আমলের ওপর নির্ভর করে না। আন্তরিকতা, সততা, বিনয় এবং সত্যের প্রতি অবিচল অবস্থানও মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করতে জানে এবং মিথ্যার আশ্রয় নেয় না, তার জন্য আল্লাহর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত থাকে।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক