ইসলামে বিনোদন

ইসলাম সহজ ধর্ম। এটি পবিত্র বিষয়বস্তুকে হালাল করেছে। দেহ, মন, শ্রম, বিশ্রাম, দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য অংশ নির্ধারণ করেছে। এখান থেকেই আত্মিক বিনোদন একটি বৈধ বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যদি তা অনুমোদিত গণ্ডির ভেতর থাকে, কোনো ওয়াজিব কাজ থেকে বিরত না রাখে এবং কোনো হারাম কাজের দিকে ধাবিত না করে।

বিনোদন এমন এক মাধ্যম, যার দ্বারা মানুষ তার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পায়, মনোবল দৃঢ় করে এবং রবের দিকে পথচলা পুনরায় শুরু করে। এটি শরিয়তের পূর্ণতা ও রহমতের অংশ। কারণ ইসলাম মানুষের প্রকৃতি জানে, তার প্রয়োজনগুলো বিবেচনা করে এবং প্রতিটি জিনিসকে তার যথোপযুক্ত স্থানে রাখে। ইসলাম কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত চাপ দেয় না, বরং তার ইচ্ছাগুলোকে বিবেচনা করে, দিকনির্দেশনা দেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত করে।

শরিয়ত সেই ফিতরাত তথা স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। কারণ মন ক্লান্ত হয়, শরীর দুর্বল হয়, অন্তর ঝিমিয়ে পড়ে। মানুষ তার উদ্দীপনার যত উচ্চতায়ই পৌঁছাক না কেন, তার একটু অবসরের প্রয়োজন হয়, যেখানে সে তার কর্মচাঞ্চল্য ফিরে পাবে, নিজের বিক্ষিপ্ত সত্তাকে গুছিয়ে নেবে এবং আল্লাহর দিকে তার পথচলা অব্যাহত রাখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে।

এ জন্যই কোরআন মুমিনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে উপকারী বিনোদনের উপায়গুলোর দিকে, যা অন্তরকে জাগ্রত করে, বুদ্ধিকে শানিত করে এবং ইমানকে দৃঢ় করে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছিলেন।’ (সুরা আনকাবুত ২০)

পৃথিবীতে ভ্রমণ করার অর্থ হলো, মহান আল্লাহর নিদর্শনগুলো দেখতে যাত্রা করা, তার অপূর্ব সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করা এবং পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। এর ফলে ইমান বাড়ে, বুদ্ধি পরিপক্ব হয় এবং মনে প্রশান্তি আসে।

মহান আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য সৌন্দর্য ও পবিত্র বস্তুগুলো বৈধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি বলুন, আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য যেসব শোভাবর্ধক বস্তু ও পবিত্র রিজিক সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে?’ (সুরা আরাফ ৩২)

কাজেই আনন্দ, সৌন্দর্য এবং পবিত্র বস্তুগুলো নেয়ামত। আর প্রতিটি নেয়ামতই দাতার শুকরিয়া দাবি করে এবং তা যদি তার সন্তুষ্টির পথে ব্যবহৃত হয়, তবে তাতে বরকত বৃদ্ধি পায়।

নবীজির সুন্নাহ এই অর্থকে আরও সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে রসিকতা করতেন, তবে সত্য ছাড়া কিছুই বলতেন না। তিনি পরিবারের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। বৈধ খেলাধুলাকে অনুমোদন করতেন। যা কিছু মানুষকে আনন্দ দেয়, তাতে অনুমতি দিতেন, যদি তা পাপমুক্ত হতো। ইসলামে বিনোদনের অর্থ দায়িত্ব থেকে পলায়ন নয়, ইবাদত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয় এবং সময়ের অপচয়ও নয়। বরং এটি হলো এক কাজ থেকে অন্য কাজে এবং এক উপকার থেকে অন্য উপকারে স্থানান্তরিত হওয়া। যাতে শরীর বিশ্রাম নিলেও অন্তর যেন গাফেল না হয় এবং মন আনন্দিত হলেও তা যেন তার রবের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

আর বিনোদন যদি নেয়ামত হয়ে থাকে, তবে নেয়ামত কখনোই পূর্ণতা পায় না, যতক্ষণ না তা আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহৃত হয়। এ কারণেই শরিয়ত বিনোদনকে এমন কিছু শিষ্টাচার দিয়ে ঘিরে দিয়েছে, যা তাকে রক্ষা করে এবং এমন নীতিমালায় আবদ্ধ করেছে, যা তাকে পরিশুদ্ধ করে। ফলে তা হালাল গণ্ডির ভেতরে থাকে, সব হারাম থেকে দূরে থাকে, নামাজ থেকে বিরত রাখে না, কোনো অধিকার নষ্ট করে না, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে না, কোনো ওয়াজিব কাজ থেকে গাফেল করে না এবং কোনো পাপের দিকে নিয়ে যায় না।

একইভাবে এতে পরিমিতিবোধ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। কেননা যা কিছু সীমা অতিক্রম করে, তা তার বিপরীতে পরিণত হয়। অনেক বৈধ জিনিসও অতিরিক্ত করার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। অনেক আনন্দ তার উপভোগকারীকে আক্ষেপ এনে দেয়। অনেক খেলাধুলা অন্তরে গাফিলতি সৃষ্টি করে এবং জীবনের এমন সময় নষ্ট করে, যা আর পূরণ করা সম্ভব নয়।

আর এখান থেকেই বোঝা যায়, বিনোদন তার বাহ্যিক রূপ দিয়ে পরিচিত হয় না, বরং তার প্রভাব দিয়ে পরিচিত হয়। যদি মানুষ বিনোদন শেষে আরও বেশি প্রশান্ত, দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয়ে ফিরে আসে এবং তার রবের আনুগত্যের দিকে ধাবিত হয়, তবে সে উপকারী বিনোদনের তওফিক লাভ করেছে। কিন্তু যদি তা তার মাঝে অলসতা, দুর্বলতা, গাফিলতি বা সময়ের অপচয় নিয়ে আসে, তবে সে পথ ভুল করেছে, যদিও সে ভাবে, সে আনন্দ উপভোগ করছে।

বর্তমান সময়ে অনেকের কাছেই বিনোদনের ধারণা কেবল পর্দার মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। ফলে ছুটির দিনগুলো ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর মাঝেই কেটে যায়। আর এর থেকে মনবিক্ষিপ্ততা, অন্তরের শূন্যতা, পরিবারের সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক এবং আল্লাহর কিতাবের সঙ্গে দূরত্ব ছাড়া আর কিছুই হয় না। এগুলো ক্ষণস্থায়ী আনন্দ, এর প্রভাব খুব অল্প সময়ের এবং এর মূল্য অনেক চড়া। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যখনই আপনি অবসর পান, ইবাদতের কঠোর শ্রমে আত্মনিয়োগ করুন। আপনার রবের প্রতিই মনোযোগ নিবদ্ধ করুন।’ (সুরা ইনশিরাহ ৭-৮)

১০ জুলাই শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান