ইরানের প্রতিশোধ তালিকা কেন

দীর্ঘদিন ইরানে যুদ্ধ চলছে। চলতি সময়ে ভিন্ন আকার নিয়েছে। ইরান দখল করতে না পারায়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ক্রমান্বয়ে ভিন্ন দিকে যাচ্ছে। এর আগে খামেনিসহ অনেক শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিজ্ঞানীকে হত্যা করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাবনা এবং যুদ্ধ ঝুঁকি। ট্রাম্প নিজেই তার ওপর ইরানের হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। ইরান তা অস্বীকার করেনি। জানিয়েছে,  ট্রাম্পের ওপর হামলার প্রস্তুতি রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ভিন্ন যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তাকে হত্যার পরিকল্পনা করতে পারে এবং তিনি দেশটির ‘হিটলিস্টে’র এক নম্বরে। গত ফেব্রুয়ারিতে নিহত হয়েছেন খামেনি। এরপর উত্তরসূরি নির্বাচিত হন পুত্র মোজতবা খামেনি। তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, দায়ীদের শাস্তি দেবেন। কিছুদিন আগে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাতে দুমাসের সংঘর্ষবিরতি ছিল। কিন্তু তখন হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজের ওপর হামলা হয়েছে।  ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, সংঘর্ষবিরতি শেষ। এখন আলোচনা চলছে। গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, গত রবিবার ইরানে আবার হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একের পর এক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলোকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। তারা হামলা শুরু করেছে একাধিক দেশে। বিশেষ করে, যেসব উপসাগরীয় দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাটি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, তাকে খুনের চেষ্টা করছে ইরান। অন্যদিকে জানিয়েছেন, এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের দিকে তাক করা আছে। সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া আছে। বলা হয়েছে,  ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা হলে ভয়ংকর হামলা শুরু হবে। এবার চূড়ান্তভাবে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের দিকে তাক করা আছে। আমাকে হত্যা বা হত্যা চেষ্টার যে হুমকি বিশে^র নানা প্রান্তে তারা দিচ্ছে, যদি কার্যকর হয় তাহলে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তাদের মাটিতে পড়বে।’

অতীতে প্রকাশ্যে পত্রিকায় ছবি ছাপিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং বিভিন্ন দেশের কর্তাব্যক্তিদের হত্যার সরাসরি হুমকি কোনো দেশ দেওয়ার সাহস পায়নি। এই মুহূর্তে ইরান মৃত্যুপরোয়ানা প্রায় চূড়ান্ত করেছে। সেখানে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড  ট্রাম্প নন, ইরানের হিটলিস্টে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টসহ কোনো কোনো বিশ^নেতা রয়েছেন, তা উঠে এসেছে ‘হামশহরি’ অনলাইন পত্রিকায়। সেই তালিকায় ট্রাম্পের পাশাপাশি নাম রয়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের। আছেন বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের নেতা। গত শনিবার জনসমক্ষে মোজতবা বলেন, ‘প্রতিশোধ নেওয়া আমাদের আকাক্সক্ষা এবং তা অবশ্যই কার্যকর হবে।’ এরপরই সংবাদপত্রে উঠে আসে, বিশ^ নেতাদের ‘হিট লিস্ট’। এএফপি জানাচ্ছে, তেহরান থেকে প্রকাশিত ‘হামশহরি’ সংবাদপত্রে ‘ইনফোগ্রাফিক’ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে মোজতবা খামেনির বক্তব্যের পাশাপাশি, বিশ^নেতাদের ছবি ছাপা হয়েছে। ইনফোগ্রাফিকে প্রথমেই রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড  ট্রাম্প। এ ছাড়াও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মারের নাম তালিকার প্রথমে রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ সচিব মার্কো রুবিয়ো, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেয়ার্ৎজরের নাম রয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন ইরান বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলে তারা ইরানের ভূখণ্ডে হামলার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে হামলায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। ফলে ইউরোপীয় নেতাদের নাম প্রতিশোধ-তালিকায় রয়েছে।

সম্প্রতি মোজতবা খামেনি দিয়েছেন প্রতিশোধের বার্তা। তারপরই ইরানের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘হিট লিস্ট’। ইরান আবার বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানে হামলা চালাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের মাসুল দিতে হবে।’ ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের কলিবফ এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘একপাক্ষিক চুক্তির যুগ শেষ হয়েছে। আমরা বলেছিলাম, নিজের কথা রাখুন অথবা মাসুল গুনুন। বাস্তবতা এখন কড়া নাড়ছে আপনার দরজায়।’  ইরানের  ‘হামশাহরি’ অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত বিতর্কিত ‘প্রতিশোধ নিশ্চিত’ গ্রাফিক তালিকায় থাকা নামগুলো হলো ১. বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। ২. ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ৩. ইসরায়েল কাটস,  ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ৪. ব্র্যাড কুপার, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস অ্যাডমিরাল। ৫. পিট হেগসেথ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ৬. মার্কো রুবিও, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ৭. মাইক হাকাবি, ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত। ৮. ইয়াল জমির, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান। ৯. জর্জিয়া মেলোনি, ইতালির প্রধানমন্ত্রী। ১০. গিডওন সার,  ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ১১. ফ্রিডরিখ মের্জ, জার্মানির চ্যান্সেলর। ১২. ইমানুয়েল মাক্রোঁ, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এবং ১৩. কিয়ার স্টারমার,  যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে সিনেটে ভোটাভুটিতে বিশাল অঙ্কের যুদ্ধ বিল আটকে গেছে। চলমান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা হয়তো খোদ ট্রাম্পই পরিষ্কার নন। কিন্তু যুদ্ধ যে একপাক্ষিক হবে না, তা প্রায় নিশ্চিত। কারণ প্রকাশ্যে ইরান থাকলেও, নেপথ্যে বিভিন্ন দেশের শক্তি ইরানের পক্ষে জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে সেসব দেশ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক সাপে-নেউলে।

লেখক : সাংবাদিক ও তালিকাভুক্ত সংবাদ পাঠক বাংলাদেশ টেলিভিশন।

tapas.raihan@gmail.com