জ্বালানি নাগরিক জীবনে অপরিহার্য চাহিদার একটি। আর্থিক সামর্থ্য ও বসবাসের স্থান বিবেচনায় নাগরিকরা চাইলেও অনেক সময় আইনি ব্যবস্থার সবদিক ঠিক রেখে পরিবার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সক্ষম হন না। এ কারণে এক শ্রেণির গ্রাহক বৈধ সংযোগ না পেয়ে অননুমোদিত সংযোগ দিয়ে অনেকটা ‘চুরি করে’ গ্যাস ব্যবহার করছেন। এই চুরি সংশ্লিষ্ট বিতরণ এলাকার কর্মকর্তাদের পুরোপুরি অগোচরে হচ্ছে, এমনও নয়। বছরজুড়ে হাজার হাজার অভিযানে লাখ লাখ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে চুরি করে গ্যাস ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না।
শুধু তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির গত কয়েক অর্থবছরের তুলনামূলক চিত্র অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য ২ হাজার ৪০১ দশমিক ০২ মিলিয়ন ঘনমিটার (এমএমসিএম) গ্যাস কেনা হয়েছে। তারা বিক্রি করে বিল পেয়েছে ১ হাজার ৭৬৬ দশমিক ৮৫ এমএমসিএম গ্যাসের। বার্ষিক হিসাবে এই ‘সিস্টেম লসের’ পরিমাণ ২৬ দশমিক ৪১ ভাগ। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তিতাসের গৃহস্থালি ‘সিস্টেম লসের’ পরিমাণ ছিল ২৪ দশমিক ৮৩ ভাগ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে গৃহস্থালির ‘সিস্টেম লস’ ছিল ১৩ ভাগ। কিন্তু এরপর ধারাবাহিকভাবে এই ‘সিস্টেম লস’ বাড়তে থাকে। তিতাস কর্তৃপক্ষ সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘সিস্টেম লসের’ পরিমাণ এখনো বের করতে পারেনি। ‘সিস্টেম লস’ বলা হলেও আসলে এই পুরো গ্যাসই চুরি হয়েছে, এমনটি বলছেন তিতাস কর্মকর্তারাই। আর সবচেয়ে বেশি চুরি হচ্ছে আবাসিক খাতে, যেখানে বেশিরভাগ বৈধ ও অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারী সীমিত আয়ের মানুষ।
বর্তমানে দেশের সর্বত্র আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। কর্তৃপক্ষ একদিকে পরিকল্পনা করছে, পুরনো সংযোগগুলো কেটে দিতে। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের পরিবর্তে সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার বাড়াতে চায় কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো অনেক গ্রাহককে গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডিমান্ড নোট করে রেখেছে। আসলে সরকার কী করতে চায়, নাগরিকদের ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের দিক বিবেচনায় রেখে সেসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া এবং তার বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের হিসাবে, শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গৃহস্থালিতে যে ২৬ দশমিক ৪১ ভাগ গ্যাস ‘সিস্টেম লস’ হয়েছে, সেই চুরি যাওয়া গ্যাস দিয়ে বছরজুড়ে ২০ লাখ পরিবারের ডাবল বার্নার গ্যাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অর্থাৎ সরকার চাইলে গ্যাসের নতুন সংস্থান না করেই আগে থেকে ব্যবহার করছে, এমন ২০ লাখ গ্রাহককে বৈধ করার সুযোগ আছে। প্রতিটি বৈধ ডাবল বার্নার গ্যাসের চুলায় প্রতি মাসে সরকার বিল নেয় ১ হাজার ৮০ টাকা। সেই হিসাবে ২০ লাখ নতুন বৈধ গ্রাহক করা গেলে মাসে ২১৬ কোটি টাকা, বছরে ২ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ আছে। অবৈধ ব্যবহারকারীরা গ্যাস নিচ্ছেনই, তাহলে এক্ষেত্রে রাজস্ব নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আদায়ে সমস্যা থাকার কথা নয়। তিতাসের পাশাপাশি বাখরাবাদসহ অন্যান্য সরবরাহ ব্যবস্থার অধীন অবৈধ ব্যবহারকারীদের বৈধ করা সম্ভব হলে রাজস্ব আদায় অনেক বাড়তে পারে।
সরকার প্রতিটি সংযোগ বৈধ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের ওপর কিছু জরিমানা আরোপ করতে পারে। তাতেও ১৩ হাজার কোটি থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আয় হতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, এই টাকা দিয়ে তিনটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা সম্ভব, যা গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে প্রতিটি অবৈধ সংযোগ বৈধ করার আগে অবশ্যই দেখতে হবে, সংযোগগুলো নিরাপদ কি না।
দীর্ঘদিন এভাবে গ্যাস চুরির সুযোগ অনেক গ্রাহক পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানির বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন। অবৈধ সংযোগ বৈধ করার পাশাপাশি চুরির সুযোগ জারি রাখার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আমরা আশা করি, সরকার গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে দ্রুত স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবে।