দেশান্তরীর বেদনায় ঘর কৈনু বাহির

‘ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর’ ডায়াসপোরা জীবনের এক নির্মম মনস্তাত্ত্বিক সত্য। চেনা জন্মভূমির ‘ঘর’ ছেড়ে যখন মানুষ দূর পরবাসে পাড়ি দেয়, তখন এক লহমায় চেনা জগৎটা উল্টে যায়। যে যান্ত্রিক, অচেনা বিদেশকে শুরুতে ‘বাহির’ মনে হতো, টিকে থাকার লড়াইয়ে একদিন সেটাই হয়ে ওঠে অবধারিত ‘ঘর’। আর পেছনে ফেলে আসা নিজের ঘর, সমাজ ও প্রিয়জনরা ভৌগোলিক দূরত্বে ধীরে ধীরে কেমন যেন ‘পর’ হয়ে যায় চণ্ডীদাসের সেই চিরন্তন আত্মহারা রূপান্তর প্রবাসীর চেনা নিয়তি।

মানুষের বুকের ভেতর একটি দেশ থাকে। পাসপোর্ট ঠিকানা বদলে দিতে পারে, নাগরিকত্ব নতুন পরিচয় লিখে দিতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের মানচিত্র সংশোধিত হয় না। পৃথিবীর দীর্ঘতম যাত্রা এক দেশ থেকে আরেক দেশে হয়; নিজের জন্মভূমি থেকে নিজের ভেতরের মানুষটির কাছে। তাই মহাভারতের যক্ষ যখন প্রশ্ন করেন ‘কে প্রকৃত সুখী?’ যুধিষ্ঠিরের উত্তর হাজার বছর পেরিয়েও আমাদের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হয় : ‘অঋণী চ অপ্রবাসী চ’  যে ঋণমুক্ত এবং প্রবাসে নয়, সেই-ই প্রকৃত সুখী। এ উত্তর সুখের অর্থনৈতিক সংজ্ঞা দেয় না; এটি বলে মানুষের শেকড়ের কথা। মানুষ জ্ঞান, জীবিকা কিংবা স্বপ্নের সন্ধানে দেশ ছাড়তে পারে, কিন্তু জন্মভূমিকে সঙ্গে নিতে পারে না। মাটি পেছনে থেকে যায়, মানুষ কেবল গন্ধ বহন করে।

এই অনির্বচনীয় বেদনার লোকজ প্রতিধ্বনি মুজিব পরদেশীর কালজয়ী গান ‘আমি বন্দী কারাগারে, আছি গো মা বিপদে’। এই কারাগারে লোহার শিক নেই; দেয়াল তৈরি হয়েছে দূরত্ব দিয়ে। এখানে ‘বাইরের আলো’ মানে কেবল সূর্যের আলো নয়; মায়ের মুখ, গ্রামের কাঁচা পথ, ভোরের আজান বা সন্ধ্যা আরতি,  শৈশবের নদী, পরিচিত ভাষার উচ্চারণ যা মানুষ দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর প্রতিদিন নতুন করে হারায়। প্রবাসের সবচেয়ে বড় শাস্তি নিঃসঙ্গতা নয়; নিজ দেশকে প্রতিদিন গভীরভাবে আবিষ্কার করার অসহায়তা।

মানুষের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, সভ্যতার প্রতিটি বড় বাঁকে রয়েছে কোনো না কোনো প্রস্থান। হিজরত, বনবাস, নির্বাসন, ভ্রমণ কিংবা প্রত্যাবর্তন শব্দগুলো কেবল ইতিহাসের ঘটনা নয়; মানবসভ্যতার আত্মজীবনী। মানুষ কখনো যুদ্ধ থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়েছে, কখনো জ্ঞানের সন্ধানে, কখনো বিশ্বাস রক্ষায়, কখনো আবার কেবল এক মুঠো অন্নের জন্য। কিন্তু প্রতিটি যাত্রার আড়লে ছিল একটি নীরব প্রতিশ্রুতি যদি ফিরে আসতে পারি, তবে আরও সমৃদ্ধ হয়ে ফিরব। ইসলামের ইতিহাসে নবী মুহাম্মদের (সা.) হিজরত সেই চিরন্তন সত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মক্কা থেকে মদিনা যাত্রা ছিল না পরাজয়ের পদচারণা; ছিল নতুন সমাজ, নতুন রাষ্ট্রচিন্তা এবং নতুন সভ্যতার সূচনা। কখনো কখনো প্রিয় ভূখণ্ড থেকে সাময়িক বিচ্ছেদ ইতিহাসকে নতুন দিকে মোড় দেয়। স্বদেশ থেকে দূরে যাওয়া তখন পালিয়ে যাওয়া নয়; ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রস্তুতি। ভারতীয় মহাকাব্যও এই শিক্ষা দেয়। পাণ্ডবরা হস্তিনাপুর ছেড়েছিলেন পরাজিত হয়ে নয়, প্রস্তুত হতে। বনবাস তাদের শক্তি কেড়ে নেয়নি; বরং ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বোধকে শানিত করেছিল। সেই কারণেই ভারতীয় সংস্কৃতিতে যুগ যুগ ধরে উচ্চারিত হয়েছে ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।’ পৃথিবীর সব অর্জনের পরও মানুষের শেষ আশ্রয় জন্মভূমি। মানুষ যত দূরে যাক, তার ফেরা শেষ পর্যন্ত কোনো শহরে নয়; একটি মাটির কাছে, একটি ভাষার কাছে, কিছু পরিচিত মুখের কাছে। হয়তো এ কারণেই স্বদেশ থেকে দূরে থাকার বেদনা কেবল সাধারণ মানুষের নয়; ইতিহাসের মহৎ মানুষদের জীবনও এর সাক্ষ্য বহন করে। কেউ নির্বাসনে নিজের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ লিখেছেন, কেউ ভিনদেশের পথে হেঁটে নিজের আদর্শ খুঁজে পেয়েছেন, কেউ আবার মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাতির ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছেন। ইতিহাস যেন বারবার এই কথাই বলে মহৎ মানুষরা অনেক সময় দেশ ছেড়েছেন, কিন্তু দেশ কখনো তাদের ছাড়েনি।

স্বদেশ থেকে দূরে থাকার বেদনা কেবল সাধারণ মানুষের নয়; মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ অনেক মানুষও এই পরীক্ষার ভেতর দিয়ে গেছেন। কার্ল মার্কস রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখে জার্মানি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বিলেতে। স্বদেশহীনতা, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যে লিখেছিলেন ‘দাস ক্যাপিটাল’-এর বড় অংশ।

চে গোয়েভারা আর্জেন্টিনা ছেড়ে লাতিন আমেরিকার পথে বেরিয়েছিলেন একজন তরুণ চিকিৎসক হিসেবে; সেই পথই তাকে বিপ্লবের প্রতীকে পরিণত করেছিল। নেপোলিয়ান সাম্রাজ্যের শিখর থেকে নেমে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছিলেন দ্বীপের নির্বাসনে। ইতিহাসের অধ্যায়গুলো আমাদের শেখায় মহৎ মানুষেরা কখনো স্বদেশ থেকে দূরে গেছেন, কিন্তু স্বদেশ তাদের অন্তর থেকে দূরে সরে যায়নি। মানুষ দেশ ছাড়তে পারে; মাতৃভূমি মানুষকে ছাড়ে না। এক পূর্ণিমায় সিদ্ধার্থের ‘ঘর’ ছেড়ে ‘বাহির’ হওয়া আসলে, চিরন্তন ডায়াসপোরা যেখানে পরম সত্যের খোঁজে মানুষ চেনা আশ্রয় হারায়। সেই নির্বাসন তাকে বুদ্ধত্ব দেয়; প্রবাসীর মতো তিনি আপন ভূমিকে ‘পর’ করে, গোটা অচেনা বিশ্বকে ‘আপন ঘর’ করেন। এ কারণে প্রবাস শুধু ভৌগোলিক ঘটনা নয়; পরিচয়ের গভীর পরীক্ষা। যোগাযোগবিদ্যা বলে, মানুষ যখন দেশান্তরী হয়, তখন সে শুধু শরীর নিয়ে স্থান বদলায় না; সঙ্গে বহন করে ভাষা, স্মৃতি, সংস্কৃতি, গান, উৎসব এবং ইতিহাস। প্রবাসে জন্ম নেওয়া শিশুর মুখে প্রথম মাতৃভাষার শব্দ উচ্চারণ করানোর চেষ্টা, দূরদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন, কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া এসব নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এগুলো হারিয়ে না যাওয়ার ঘোষণা। দূরত্ব মানুষের ঠিকানা বদলায়, পরিচয় নয়। এই সত্যটি আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন বেনেডিক্ট আনডেরসন তার বিখ্যাত ‘ইমাজিনেড কমিউনিটিস’ গ্রন্থে। তর মতে, জাতি কেবল মানচিত্রে আঁকা সীমারেখা নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, ভাষা, কল্পনা ও অভিন্ন অনুভূতিতে গড়া এক আত্মিক সমাজ। তাই লন্ডন, দোহা, টরন্টো কিংবা মেলবোর্নে বসবাসকারী একজন বাংলাদেশিও প্রতিদিন দেশের সংবাদ পড়েন, বিজয় দিবসে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান, সন্তানের নাম বাংলা উচ্চারণে ডাকেন। ভৌগোলিক দূরত্ব তাকে দেশের বাইরে নিয়ে যায়; কিন্তু মানসিক ভূগোল তাকে দেশের ভেতর ধরে রাখে।  বাংলাদেশের ইতিহাস এই দীর্ঘ যাত্রারই ইতিহাস। ঔপনিবেশিক আমলে সিলেটের নাবিকরা সাত সমুদ্র পেরিয়ে ব্রিটেনে বসতি গড়েছিলেন। চট্টগ্রামের লস্করেরা দূর সমুদ্রবন্দরে বাংলার পরিচয় বহন করেছিলেন। স্বাধীনতার পর মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে লাখ লাখ বাংলাদেশির পদচারণা শুরু হয়; তাদের পাঠানো অর্থ শুধু পরিবারের চুলায় আগুন জ্বালায়নি, দেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত গড়েছে। আজ সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রজন্ম যারা গবেষণা, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিশে^র নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। সময় বদলেছে, পেশা বদলেছে, গন্তব্য বদলেছে; কিন্তু বিদায়ের মুহূর্তে মায়ের চোখের জল বদলায়নি। 

দক্ষিণ এশিয়ার এই বাস্তবতায় বিমানবন্দরে অভিবাসনের দুটি মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন তরুণ বিদেশে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে; আরেকজন মরুভূমির নির্মাণশিবিরে। একজনের ব্যাগে বই, অন্যজনের ব্যাগে শ্রমের পোশাক। কিন্তু দুজনই যখন বিমানবন্দরের বিদায়ঘরে শেষবারের মতো মায়ের হাত ছেড়ে এগিয়ে যায়, তখন তাদের অশ্রুর ভাষা আলাদা থাকে না। শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত- প্রবাসের প্রথম অভিধান সবার জন্য এক; সেখানে প্রথম শব্দটি হলো বিদায়।  তবু প্রশ্ন থেকে যায় মানুষ যদি সুখী হতে নিজের মাটিতে থাকতে চায়, তবে পৃথিবীতে এত অভিবাসন কেন? উত্তরটি নির্মম। অনেকে দেশ ছাড়ে না ইচ্ছায়; ছাড়ে প্রয়োজনের কাছে মাথা নত করে। কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য, কেউ গবেষণার জন্য, কেউ যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে, আবার কেউ সন্তানের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে। তাই প্রবাসের প্রতিটি গল্পের পেছনে একটি স্বপ্ন থাকে। কিন্তু প্রতিটি স্বপ্নের নিচে চাপা পড়ে যায় বিদায়ের কান্না। ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের ওয়ার্ল্ড মাইগ্রেশন রিপোর্ট ২০২৪ জানায়, আজ বিশ্বের প্রায় ২৮১ মিলিয়ন মানুষ নিজ জন্মভূমির বাইরে বসবাস করছে। অন্যদিকে বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণা দেখায়, প্রবাসী মানুষের পাঠানো অর্থ উন্নয়নশীল বহু দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও রেমিট্যান্স কেবল বৈদেশিক মুদ্রা নয়; অসংখ্য পরিবারের ভাতের হাঁড়ি, সন্তানের লেখাপড়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ আর গ্রামে একটি নতুন টিনের ছাদের নাম। কিন্তু অর্থনীতির এই সাফল্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকে আরেকটি অদৃশ্য হিসাব যে হিসাব কোনো প্রতিবেদনে লেখা হয় না। প্রবাসের শেষ ভাষা অর্থনীতি নয়, আবেগ। শেষ হিসাব বৈদেশিক মুদ্রায় নয়, স্মৃতিতে। সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’ সিনেমার ভূ-পর্যটক মনোমোহন মিত্র শৈশবে ছুটন্ত বাইসনের আদিম গুহাচিত্র দেখে, পৃথিবীকে জানার নেশায় ঘর ছেড়েছিলেন। তার ভ্রমণ ছিল কৌতূহল, জ্ঞান অন্বেষণের। কিন্তু ফিরে এসে ভাগ্নি অনীলা ও স্বামী সুধীন এবং দর্শক হিসেবে আমাদের মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদী, সংকীর্ণ মানসিকতার সামনে তিনি রেখে যান এক ঐতিহাসিক শিক্ষা মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মুক্ত চিন্তা; কূপম-ূক হয়ে বেঁচে থাকা নয়। তাই দেশ ছেড়ে যাওয়া যদি জ্ঞান, মানবতা ও বৃহত্তর বোধের জন্য হয়, তবে সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত জন্মভূমিকে আরও গভীরভাবে আবিষ্কারের আরেকটি পথ। হয়তো এ কারণে মানুষ ‘দেশ’ ছাড়ে, কিন্তু ‘মাতৃভূমি’ নয়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।

rajibnandy@cu.ac.bd