টানা বৃষ্টিপাত ও উজানের পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জের চার উপজেলায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যহত রয়েছে। ফলে যমুনা নদীপাড়ের গ্রাম গুলিতে নদী ভাঙ্গণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উপজেলা গুলি হলো- সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও চৌহালী।
এছাড়া জেলার ৩১ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। নদী ভাঙ্গণের তীব্রতা আশংকাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় নদীপাড়ের অসহায় হতদরিদ্র মানুষের মাঝে চরম ভাঙ্গন আতংক বিরাজ করছে।
যমুনার ভাঙ্গনের তান্ডবে সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে জেলার শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসী, বারপাখিয়া ও মোহনপুর গ্রামের শত শত অসহায় দরিদ্র মানুষ। এছাড়া কাজিপুর, চৌহালী, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বিস্তৃর্ণ এলাকায় ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় সেখানকার শত শত মানুষের বাড়িঘর চোখের সামনে যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বাড়িঘর ও আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সময় পাচ্ছে না।
এলাকাবাসী জানায়, গত ২ সপ্তাহে শাহজাদপুর, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও চৌহালী উপজেলায় শতাধিক বাড়িঘর যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় অনেক মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় তারা ভাঙ্গনকবলিত এলাকায় পলিথিনের ছাউনি তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এদিকে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার ৮৩ ইউনিয়নের মধ্যে ৩১টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছে।
নদীভাঙ্গনের ঝুঁকি বিবেচনায় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। পুলিশের ফেসবুক সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, চৌহালী উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চরছলিমাবাদ, ওমারপুর ইউনিয়নের ভূতের মোড় এবং খাসপুখুরিয়া ইউনিয়নের শাকপাল এলাকায় নদীভাঙ্গনে আবাদি জমি ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমীন বলেন, সিরাজগঞ্জ যমুনা নদীর তীরবর্তী জেলা হওয়ায় এখানে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে জেলার ৮৩ ইউনিয়নের মধ্যে ৩১টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কাজীপুরের ৭টি, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ৪টি, বেলকুচির ২টি, চৌহালীর ৫টি, শাহজাদপুরের ৮টি এবং উল্লাপাড়ার ২ ইউনিয়ন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য বন্যা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় জেলার ৯ উপজেলায় ৯টি এবং ৮৩ ইউনিয়নে ৮৩টি বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধ মজুদ রাখা হয়েছে। পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে মাইকিংসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জনগণকে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার, খাবার ঢেকে রাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুর ও কুরসী গরুর হাট-বাজার যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও গরু-ছাগল বেচাবিক্রিতে চরম ভাটা পরেছে। ফলে এখানকার কৃষকেরা চরম অর্থকষ্টে পরেছে। ভাঙ্গন কবলিত বাড়িঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ না দেওয়ায় তারা অন্ধকারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। গরু চুরি ঠেকাতে চৌকি পেতে পাহাড়া দিচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে চলতি এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের লেখাপড়া চরম বিঘ্নিত হচ্ছে। গরমে গরু-বাছুরের প্রাণ হাসপাস করছে।
এ বিষয়ে ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হাফিজ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ও জিন্নাহ মন্ডল জানান, এখানকার ভাঙ্গনরোধে ভাঙ্গনকবলিত স্থানে বালিভর্তি জিওটিউব বস্তা ফেলা হলে এ গ্রামগুলি ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা পেতো। কিন্তু সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড চরবাসিকে মূল্যায়ন না করায় এখানে বালুরবস্তা ফেলার উদ্যোগ নেয়নি। ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডেও চরম অবহেলায় আমাদের গ্রামগুলি যমুনা নদীতে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। তারা আরও বলেন, এখানকার ১০/১২টি স্থানে বাঁশের ছটকা তৈরি করে বালুর বস্তা ডাম্পিং করা হলে ভাঙ্গনরোধ করা সম্ভব হবে। তাই অবিলম্বে এখানে এ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা বলেন, যমুনা নদীর ভাঙ্গনে আমার ৮ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব জমিতে আমি ভুট্টা, ধান, সরিষা, বেগুন, টমেটোসহ নানা জাতের সবজি চাষ করে স্বচ্ছল জীবন যাপন করতাম। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি পথে বসে গেছি। আমার গোষ্ঠীর সবার মিলে প্রায় ৬০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে জমিজমা হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি।
ধীতপুর গ্রামের আছিয়া খাতুন জানান, যমুনা নদীর ভাঙ্গনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় শুণ্য ভিটায় খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে আছি। বৃষ্টি এলে সবকিছু ভিজে যায়। কোথায় যাবো তা এখনও ঠিক হয়নি। ছেলে মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
এ গ্রামের শামছুল হক জানান, যমুনা নদীতে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় পাশের শ্রীপুর গ্রামে অন্যের জমিতে বছরে ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় আশ্রয় নিয়েছি। বছর শেষে এতো টাকা কিভাবে পরিশোধ করবো তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় আছি।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবরিনা সারমিন জানান, ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানকার পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণের চাল বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্তদের পূণর্বাসনেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মখলেছুর রহমান জানান, শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নটি যমুনার চরাঞ্চল এলাকা। চরাঞ্চল রক্ষায় আমাদের কোনো প্রকল্প না থাকায় এ উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুর ও কুরসী এলাকায় কোনো কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এ ধরণের প্রকল্প পাওয়া গেলে সেখানে অবশ্যই কাজ করা হবে।