মেহেরপুরে বাড়ছে চরমপন্থা আতঙ্ক

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা মেহেরপুরে একের পর এক হুমকিসংবলিত চিরকুট ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার, মুজিবনগরে অপহরণ এবং পুলিশের ওপর ককটেল হামলার ঘটনাগুলো ঘিরে পুরনো চরমপন্থি নেটওয়ার্ক নিয়ে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলে দাবি করছে। তবে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে এই নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। প্রশ্ন উঠছে, এক সময় চরমপন্থার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মেহেরপুরে কি আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে পুরনো গোপন সংগঠনের ছায়া?

এক সময় বাংলাদেশের চরমপন্থি রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল সীমান্ত জেলা মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা। ১৯৬৭ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের প্রভাব পড়ে পশ্চিমবঙ্গঘেঁষা এই অঞ্চলে। স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকজন সম্মুখসারির মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বে এখানে গড়ে ওঠে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি। যা পরবর্তী সময়ে সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে সংগঠনটি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মেহেরপুর অঞ্চলে ওই সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) হক গ্রুপ। অন্যদিকে গাংনী-কুষ্টিয়া এলাকায় গড়ে ওঠে শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন ও জাসদের গণবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে থাকা অস্ত্র এবং সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করে এ সব সংগঠনের তৎপরতা। তবে ৮০ ও ৯০ দশকে তারা আদর্শিক রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে বিচ্যুত হতে থাকে। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ নিজেদের স্বার্থে চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করলে আদর্শের জায়গা দখল করে নেয় অর্থ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বড় সংগঠনগুলো ভেঙে ছোট ছোট দলে পরিণত হয় এবং গড়ে ওঠে আলাদা কমান্ড ইউনিট। তখন শ্রেণিশত্রু আখ্যা দিয়ে মানুষের ছবিসহ পোস্টার দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটিয়ে দিয়ে তাদের হত্যার ঘোষণা দেওয়া হতো।

এই সময় মেহেরপুরে আলোচনায় আসে লাল্টু, রুহুল, সবুজ, সিরাজ, আকু, হামিদ, বাবলু, ঈমান, আনারুল ইসলাম, বাবলু বিশ্বাস এবং আমাম হোসেন মিলুসহ কয়েকটি নাম। এরা চরমপন্থি সংগঠন হিসেবে জনযুদ্ধ, লালপতাকা, সর্বহারা নামে বিভিন্ন গ্রুপ গড়ে তোলে। পরে আরও বিভক্তি দেখা দিলে ব্যক্তি নামে গড়ে ওঠে চরমপন্থি এই সব সংগঠন।

২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রকাশ্যে অস্ত্র ভা-ারের কথা বলে নতুন করে আলোচনায় আসেন সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ভগ্নিপতি মেহেরপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সামাদ বাবলু বিশ্বাস। তিনি প্রকাশ্যে জনসভায় ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন ‘আমার সঙ্গে লড়তে এসো না মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। কারণ আমার চাইতে অস্ত্র, অর্থ, সন্ত্রাসী কারও বেশি নেই।’ আর আমাম হোসেন মিলু পরিচিত ছিলেন সমন্বয়কারী হিসেবে।

অর্থ, অস্ত্র ও সংঘর্ষ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন তিনি। এই আমাম হোসেন মিলু আত্মসমর্পণ করে ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে তিনি মুজিবনগর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরই মাঝে সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও তার স্ত্রী সৈয়দা মোনালিসার সঙ্গে সখ্যের সূত্র ধরে মেহেরপুর জেলায় অনলাইন জুয়া ক্যাসিনোকা-ের নিয়ন্ত্রক বনে যান। মিলুর সাবেক সহযোগী সোহাগ হোসেন জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও একাধিক মামলার আসামি হয়েও আমাম হোসেন মিলু অর্থের জোরে এখনো রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঢাকার উত্তরায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং কয়েকজন বিএনপি ও জামায়াত নেতাকে ম্যানেজ করে এখনো অনলাইন ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক হয়ে রয়েছেন। এই ক্যাসিনোর মাধ্যমে তিনি প্রায় হাজার কোটি টাকার সম্পদ করেছেন।

মেহেরপুর জেলায় চরমপন্থার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল নির্মমতা। প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, অপহরণ, গুম, পাঁচ খ- করে বীভৎস জবাই, এমনকি জ¦লন্ত ইটভাটার চুল্লির মধ্যে ফেলে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারার মতো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ঘটনা তখন ছিল ভয়াবহ বাস্তবতা। চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আর অস্ত্রের মহড়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ লেগেই থাকত।

১৯৯৬ সালের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে শীর্ষ নেতাদের অনেকে গ্রেপ্তার বা নিহত হন। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দুর্বল হতে থাকে সংগঠনগুলো। ২০০০ সালের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করে। অনেকেই আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। আবার কেউ কেউ যুক্ত হন মূল ধারার রাজনীতিতে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২১ মে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সাত জেলার ৩১৫ জন চরমপন্থির আত্মসমর্পণ পরিবর্তন বিষয়টিকে আরও দৃশ্যমান করে।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি স্বস্তি দিচ্ছে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুর সদর উপজেলায় বিভিন্ন মামলায় সাজা ভোগের পর এখনো জীবিত চরমপন্থির সংখ্যা প্রায় ২২ জন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. সুবাদ আলী (সুবা), মো. সোনা মিয়া (সোনা), মো. সাবেদ আলী শেখ, মো. সাগর আলী শেখ, আজেপ শেখ, আ. সামাদ, মো. রইচুল ইসলাম, আ. খালেক, হামিদুল ইসলাম (হামিদ), মো. খোকন, মো. শাহজাহান মালিথা, সাইদুর রহমান (সাজু), হামিদুল ইসলাম (দ্বিতীয়), খন্দকার শাহিন, মো. মকবুল, মো. আমিরুল ইসলাম, মো. ইমরান, খন্দকার শফিক, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আরিফুল ইসলাম, মো. ইমাম এবং খালেক। জানা গেছে, মেহেরপুরের তিনটি থানার কাছে এ ধরনের আরও তিনটি হালনাগাদ তালিকা রয়েছে।

মেহেরপুরের পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায় বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে জেলায় চরমপন্থিদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। অনেকেই সাধারণ জীবনে ফিরে গেছেন, কেউ মারা গেছেন, আর জীবিতদের একটি অংশ মূল ধারার রাজনীতিতে থিতু হয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। চরমপন্থায় জড়িতদের হালনাগাদ তালিকা সংরক্ষণ করে তাদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় তাদের পুনরায় সেই পথে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য বলেই মনে করছি।’

অপহরণ, মুক্তিপণ, পুলিশের ওপর ককটেল হামলা : চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলায় সন্ধ্যায় কলেজছাত্র মাহিদ হোসেন ও তার দুই বন্ধু রিয়াদ ও জুনায়েদকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। রিয়াদ ও জুনায়েদকে ছেড়ে দেওয়া হলেও মাহিদকে আটক রেখে পরিবারের কাছে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। গভীর রাতে পুলিশ টেংরামারী গ্রামের একটি মাঠে অপহৃতদের উদ্ধারে গেলে পুলিশের ওপর দুটি শক্তিশালী ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং চোখ-হাত বাঁধা মাহিদকে ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

একের পর এক বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার : এক সময়ের বোমার জেলা মেহেরপুরে আবারও বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের ৯ জুলাই পর্যন্ত মেহেরপুরের তিন উপজেলায় অন্তত ২৮টি বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার হয়েছে বলে জেলা পুলিশের সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ১১টি। প্রতিটি বোমা উদ্ধারের সময় সঙ্গে চাঁদা দাবি অন্যথায় প্রাণনাশের হুমকিসংবলিত চিরকুট পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত চলমান থাকায় উদ্ধার হওয়া আলামতগুলো প্রকৃত বিস্ফোরক নাকি কেবল আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তৈরি নকল বস্তু, এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ।

তবে এ সব ঘটনার পেছনে চরমপন্থি কর্মকা-ের উত্থান ঘটছে তা মানতে নারাজ পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, অপহরণকারী চক্রের পরিচয়, ব্যবহৃত বিস্ফোরকের উৎস, সম্ভাব্য সহযোগী নেটওয়ার্ক এবং ঘটনার পেছনে কোনো সংগঠিত বা উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না এ সব বিষয় এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

সমাজ বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি সংগঠিত অপরাধচক্রের তৎপরতা অথবা প্রশাসনের সক্ষমতা যাচাইয়ের অপচেষ্টা। যেকোনো ক্ষেত্রেই বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) মেহেরপুর জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাম রাজনীতির সূচনা হয়েছিল শোষণের বিরুদ্ধে মার্কসবাদ, লেনিনবাদ আদর্শের ভিত্তিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কিন্তু স্বাধীনতার পর আদর্শগত বিভেদ, নেতৃত্বের সংকট, আর্থিক স্বার্থ এবং মূল ধারার রাজনীতির হস্তক্ষেপে বহু সংগঠন ভেঙে অসংখ্য চরমপন্থি উপদলে পরিণত হয়। এ সব কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে কমিউনিস্টদের সম্পর্কে ভুল ধারণার জন্ম হয়। প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পরবর্তী সময়ে ওইসব ভন্ড নামধারী বাম সংগঠনের সন্ত্রাসী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে নিজেদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালু রেখেছে। আদর্শের রাজনীতি ক্রমে অস্ত্র ও ক্ষমতার রাজনীতিতে রূপান্তরিত হয়। যার নির্মম মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। সে সময় লাল্টু, রুহুল, সবুজ, সিরাজ, আকু, হামিদ, বাবলু, ঈমান, আনারুল ইসলাম, বাবলু বিশ্বাস ও আমাম হোসেন মিলুসহ কয়েকজনের নাম ব্যাপকভাবে আলোচনায় উঠে আসে। বিগত সময়ে এদের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।