প্রথম দেখাতে আকনাদি লতাটি এমনভাবে তার সুন্দর পাতাগুলো নিয়ে পূর্ণচোখে তাকিয়ে থাকে যে মনে হয়, ফুল নয়, যেন পাতাই এর একেকটি জ¦লজ¦লে কথা!
আমাদের বসতবাড়ির আশপাশ, পতিত জায়গা, বনতল, জলাভূমির ধার, পথের দুপাশে যখন-তখন দেখতে পাওয়া যায় যে-কয়টি লতা, তার মধ্যে আকনাদি অন্যতম। দেশীয় লতাটির অনেকগুলো নাম রয়েছে, তার মধ্যে নিমুখা, আকন্দি, মাকন্দি, মুছিলতা, মুছিন্দা, পাটামুছন্দি, মানিক, পাঠা, একলেতি প্রভৃতি। নামের প্রকার-বাহার দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশ-জুড়ে এটি বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ইংরেজিতে এর নাম Snake vine; বাংলা করলে দাঁড়ায় সাপলতা। হ্যাঁ, সাপলতাই; কেননা এর ডালপালা কোনো কিছুকে, বিশেষ করে কোনো গাছকে অবলম্বন করে আষ্টেপৃষ্ঠে সর্পিলভাবে ওপরের দিকে বেয়ে ওঠে।
ভারত ও নেপাল থেকে একাধারে জাপান পর্যন্ত এবং শ্রীলঙ্কা, মালয় দ্বীপপুঞ্জ, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার উষ্ণম-লীয় দেশগুলোতে এর দেখা মেলে। আসলে এ লতাটির নমুনা প্রথমে জাপান থেকে জোগাড় করা হয়েছিল বলেই উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামের (Stephania japonica) ) পেছনে japonica যোগ হয়েছে কেবল। আকনাদি লতা বহুবর্ষজীবী। গোড়ার দিকের কান্ড কিছুটা কাষ্ঠল। কান্ড ও ডাল নলাকার, মসৃণ ও শিরালো। কচি ডাল অনেক সময় রোমশ। লাউয়ের মতো এর কোনো আকর্ষী tendril) নেই, ডালগুলোই সে-কাজ করে সাপের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওপরে ওঠে।
আকনাদির পাতা কালচে সবুজ, কিছুটা ফিকে সবুজও; প্রশস্ত ত্রিভুজ কিংবা ডিম্বাকৃতির; ৩-১২ সেমি লম্বা ও ২-৯ সেমি চওড়া। আকৃতি অনেকটাই বর্শার ঢালের মতো। আগার দিকটা, আমরা বলব লেজ, বেশ প্রসারিত, ক্রমশ চিকন। অন্যান্য পাতায় বোঁটা যে রকম ফলকের গোড়ায় লেগে থাকে এটির ক্ষেত্রে তা লেগে থাকে পাতার মাঝামাঝি। বোঁটার সংযুক্তির জায়গা থেকে শিরাগুলো চারদিক ছড়ানো থাকে, যা পাতার সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান কারণ।
আকনাদির একই লতায় দুই ধরনের ফুল ধরে। পুরুষ ফুল সবজেটে সাদা কিংবা হলদেটে, ফুলের বোঁটা প্রায় নেই বললেই চলে। পাপড়ি ৩-৪টি। স্ত্রীফুল পুরুষের মতোই কমবেশি দেখতে, বৃত্যাংশ ও পাপড়িসংখ্যাও তাই। তবে মাঝেমধ্যে এর বৃত্যাংশের সংখ্যা কম হতে পারে। বর্ষায় আকনাদির ফুল আসে। ফলগুলো ১ সেমি ব্যাসের, গোল কিংবা লম্বাটে। কাঁচা ফলের রঙ সবুজ। এরপর হলুদ, কমলা হয়ে টকটকে লাল রঙ ধারণ করে।
রোগনাশিনী হিসেবে আকনাদির বেশ সুনাম রয়েছে চরক-সুশ্রুতের আমল থেকে। দইয়ের সঙ্গে আকনাদির শেকড় খাওয়ালে কলেরায় উপকার পাওয়া যায়। পাতা ঘোলের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে আমাশয় ভালো হয়। উদ্ভিদটির রয়েছে পিত্তজ্বরনাশক গুণ। বদহজমজনিত অরুচিতে এর পাতার বাটা ঘিয়ে-ভাজা ভাতের সঙ্গে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।