সাথি ফসল চাষে আসবে সমৃদ্ধি

বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং কৃষিই তাদের জীবন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। গ্রামের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। অর্থাৎ, দেশের জাতীয় ও অর্থনৈতিক উন্নতি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নতির উপরই নির্ভর করে। আর আমাদের গ্রামীণ উন্নয়নের ভিত্তি যেহেতু কৃষি, তাই কৃষি কার্যক্রমকে জোরদার করেই এগিয়ে যেতে হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনের বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। আর এ কর্মসূচি সফল বাস্তবায়নের জন্য সীমিত জমি থেকে অধিক ফসল বা একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে সাথি ফসলের চাষ বাড়ালে উপকৃত হবেন কৃষক।

সাথি ফসলের পরিচয়

যে পদ্ধতিতে দুই বা ততধিক ফসল একত্রে জমিতে পর্যায়ক্রমে কিংবা একই সঙ্গে উৎপাদন করা হয়, সেই পদ্ধতিকে সাথি বা আন্তঃফসল চাষ (Inter cropping) বলে। কেউ কেউ ভাবে একটি ফসলের সঙ্গে অন্যটিকে সাথি হিসেবে চাষ করে পাওয়া যায় একটি বাড়তি ফসল। এই পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদি ফসলকে প্রধান ফসল (Principal Crop) এবং স্বল্পমেয়াদি ফসলকে সাথি ফষল (Inter Crop)

বলা হয়।

প্রতি বছর বৃক্ষরোপণ অভিযান উপলক্ষে দেশে বিপুলসংখ্যক ফলদ, বনজ এবং ওষুধি বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়। বাগান আকারে বনজ, ফলদ ও ওষুধি বৃক্ষ রোপণের পর চারা অবস্থায় দুই সারির মাঝখানে অনেকখানি জমি খালি অবস্থায় পড়ে থাকে। এসব খালি জায়গা অনাবাদী না রেখে স্বল্পমেয়াদি কোনো ফসল সাথি হিসেবে চাষ করা যায়। এতে প্রধান ফসল বনজ, ফলদ এবং ওষুধি গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং বৃক্ষের বাগানে সাথি ফসল চাষ করে নিম্নলিখিত সুবিধাসমূহ পাওয়া যায়।

১. বাগান আকারে বৃক্ষের চারা রোপণের পর কয়েক বছর বাগান থেকে কোনো অর্থ পাওয়া যায় না। তাই এ সময়ে সাথি ফসলের চাষ করলে জমি থেকে একটা বাড়তি ফসল ও কিছু নগদ অর্থ পাওয়া যায়।

২. সাথি হিসেবে ডাল জাতীয় শস্যের চাষ করলে যেমন অতিরিক্ত ফসল ঘরে উঠে, তেমনি জমির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

৩. চাষ করা জমিতে আগাছা ও পোকা-মাকড়ের উপদ্রব কম হয়।

৪. জমিতে সারা বছর ফসল থাকায় মাটি আবৃত থাকে ফলে মাটির ক্ষয়রোধ হয়।

৫. শুষ্ক মৌসুমেও বৃক্ষের বাগানে মাটিতে জলীয় রসের অভাব পড়ে না।

৬. আন্তঃফসলের যত্ন ও পরিচর্যার সঙ্গে সঙ্গে প্রধান ফসল গাছপালার যত্ন-পরিচর্যার কাজও একই শ্রমে ও একই খরচে হয়ে যায়। এতে প্রধান গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়।

৭. স্বল্পমেয়াদি সাথি ফসলে ব্যবহৃত সমুদয় সার আহরিত হয় না। বিধায় মাটিতে কিছু সার থেকে যায়, যা পরবর্তীতে গাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং গাছের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

সাথি ফসল নির্বাচন

প্রধান শস্য ও সাথি ফসল একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বৃক্ষের বাগানের জন্য আন্তঃ বা সাথি ফসলকে কয়েক শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন ফলজাতীয় শস্য : পেঁপে, কলা, বাঙ্গি, তরমুজ, আনারস।

শাকসবজি : ডাঁটা, লালশাক, গীমা, কলমিশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, মুলা, বেগুন, বরবটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, আলু, মুখি কচু, উচ্ছে, শসা, ঢেঁড়স, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি।

মসলাজাতীয় শস্য : পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ধনে, আদা, হলুদ প্রভৃতি।

ডালজাতীয় শস্য : মসুর, ছোলা, মটর, মুগ, মাসকলাই, সয়াবিন প্রভৃতি।

তেল শস্য : সরিষা, চিনাবাদাম, তিল।

দানা শস্য : ধান, গম, ভুট্টা প্রভৃতি।

সাথি ফসলের নিয়মাবলী

সাথি ফসল চাষের ক্ষেত্রে সঠিক উপায়ে জমি তৈরি করতে হবে। জমি তৈরির সময় প্রধান গাছের শিকড় যেন কাটা না পড়ে, সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

প্রধান ফসলের দুই সারির মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় আন্তঃশস্য বপণ বা রোপণ করতে হবে।

বারবার একই ফসল চাষ না করে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রকার ফসল চাষি হিসেবে চাষ করা উচিত।

সার প্রয়োগের দিক থেকে মনে রাখতে হবে, প্রধান প্রধান গাছগুলোর জন্য যে সার দেওয়া প্রয়োজন, তা যেন বাদ না পড়ে। আবার আন্তঃ ফসলের জন্য স্বাভাবিক শস্যরূপে যে পরিমাণ সার যখন দেওয়া দরকার, তা যেন তখন প্রয়োগ করা হয়। অর্থাৎ, এক গাছের কারণে যেন অন্য গাছের খাদ্য ঘাটতি না হয়।

প্রধান গাছ যত বড় হয়ে অধিক স্থান জুড়তে থাকবে, গাছের গোড়া থেকে ততই দূরে আন্তঃফসল জন্মাতে হবে এবং সেভাবে সারও প্রয়োগ করতে হবে। বনজ, ফলদ ও ওষুধি বৃক্ষের জন্য সারের পরিমাণ বছরের পর বছর ধরে যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি তার অধিক জায়গাজুড়ে প্রয়োগ করতে হবে। এভাবে বনজ, ফলদ ও ওষুধি গাছ এবং আন্তঃফসলের মধ্যে একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিরাজ করবে।

যে সমস্ত জমিতে প্রয়োজনীয় পানির অভাব-সেক্ষেত্রে আন্তঃ শস্যের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।

পোকা-মাকড় ও রোগ-বালাই দমন ব্যবস্থা আন্তঃফসলের নিজের চাহিদামতো হতে হবে। বৃক্ষের বাগানে জন্মানোর কারণে যে তা অন্য প্রকারের হবে, তা কিন্তু ঠিক নয়। অবশ্য বনজ, ফলদ ও ওষুধি গাছ বেশ কিছুটা বড় আকারে ধারণ করার পর অর্থাৎ যখন বাগানে ওইসব বৃক্ষের অনেকটা ছায়া পড়তে থাকে, তখন আন্তঃফসলের রোগ-বালাই ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। এ জন্য এসব পোকা মাকড়ের আক্রমণ ও তা দমনের জন্য একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

সাথি ফসল তোলার পর ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে, নতুবা তা মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দেওয়া উচিত।

লেখক : উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (অব.), উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা