হাওরাঞ্চলে নতুন উদ্যোগ

বছরে দুবার ভুট্টা ঘাস উৎপাদন

হাওরে বাস্তুতন্ত্র প্রায় ২০ লাখ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত, যা বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪ শতাংশ। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় এটি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার পর গবাদিপশু তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়ে। পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে কৃষকরা অনেক সময় গবাদিপশু কম বয়সেই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন, যার ফলে পারিবারিক আয় ও গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা উভয়ই হ্রাস পায়।

সংকটের সমাধান

হাওর অঞ্চলের এই সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজছিলেন কৃষিবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে। এমতাবস্থায় কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) গবেষণা অনুদানের আওতায় পশুখাদ্য সংরক্ষণের একটি টেকসই প্রযুক্তি প্রবর্তন করা হয়েছে। কেজিএফের অর্থায়নে ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি শুরু হয়। এতে প্রধান গবেষক হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক ড. খান মো. সাইফুল ইসলাম। পাশাপাশি কেজিএফের একটি কারিগরি দল এই প্রকল্পটির নিবিড়ভাবে তদারকি করেছেন। দলটিতে ছিলেন নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. নাথু রাম সরকার, জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ (জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সম্পদ) ড. মো. মনোয়ার করিম খান, জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ (উদ্যান ফসল) ড. এম. নাজিরুল ইসলাম এবং জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ (প্রাণিসম্পদ) ড. মো. এরশাদউজ্জামান। সম্প্রতি তারা প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন, সাইলেজ তৈরি ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন এবং হাওর অঞ্চলে এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে উৎসাহ প্রদান করেন।

দীর্ঘদিনের গবেষণার পর এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বছরে দুবার ভুট্টা ঘাস উৎপাদন এবং সাইলেজ (সংরক্ষিত পশুখাদ্য) তৈরির ওপর ভিত্তি করে একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। দানার জন্য ভুট্টা সংগ্রহের পরিবর্তে কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে দুবার সম্পূর্ণ ভুট্টা গাছ (সবুজ ঘাস হিসেবে) চাষ করেন এবং বর্ষাকালে গবাদিপশুকে খাওয়ানোর জন্য তা সাইলেজ হিসেবে সংরক্ষণ করেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বছরে একবার ভুট্টা চাষের পরিবর্তে পশুখাদ্য হিসেবে বছরে দুবার ভুট্টা চাষ করলে কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সারা বছর গবাদিপশুর খাদ্যের নিশ্চয়তা থাকে এবং মৌসুমি বন্যাকালীন সময়ে জীবিকা নির্বাহ সহজ হয় এবং গবাদিপশু পালন স্থায়িত্ব লাভ করে। বর্ষাকালে ছয় মাস ধরে চলা জলমগ্ন অবস্থায় পশুখাদ্যের তীব্র সংকট সমাধানে সহায়তা করবে।

এই দ্বৈত-চক্র ভুট্টা ঘাস উৎপাদন পদ্ধতির ফলাফল ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এতে প্রতি একরে প্রায় ৩২ দশমিক ৭ টন বায়োমাস উৎপাদিত হয়েছে, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় আটগুণেরও বেশি। যদিও এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি, তবুও শুধু দানার জন্য উৎপাদিত ভুট্টার তুলনায় এই পদ্ধতিতে চার গুণেরও বেশি মুনাফা অর্জিত হয়েছে।

অধ্যাপক ড. খান মো. সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, সংরক্ষিত ভুট্টার সাইলেজ দুগ্ধবতী গরুর জন্য অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে খাওয়ানোর মাধ্যমে দেখা গেছে, সাইলেজ ব্যবহারের ফলে বন্যা মৌসুমে গরুর দৈহিক ওজন হ্রাস রোধের পাশাপাশি দৈনিক গড় দুধের উৎপাদন প্রতি গরুতে ৩ দশমিক ৭ লিটার থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৫৮ লিটারে উন্নীত হয়েছে। গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, হাওর অঞ্চলে গবাদিপশুর প্রচলিত খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ধানের খড়ের তুলনায় ভুট্টার সাইলেজ অনেক বেশি পরিমাণে প্রোটিন ও শক্তি সরবরাহ করে।

ড. সাইফুল জানান, কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর, মহিষারকান্দি ও উরিঅন্দ গ্রামের তিন শতাধিক কৃষক এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেন। যদিও শুরুতে কৃষকদের কাছে সাইলেজ তৈরির বিষয়টি অপরিচিত ছিল, তবুও বর্ষাকালে গবাদিপশুর উন্নত স্বাস্থ্য, অধিক দুধ উৎপাদন এবং খাদ্যের সংকট কমে যাওয়া প্রত্যক্ষ করার পর তারা দ্রুত এই প্রযুক্তিটি গ্রহণ করেন। এই সাইলেজের ধারণাটি হাওর অঞ্চলে ভুট্টা চাষবিষয়ক চিন্তাধারায় একটি পরিবর্তন নিয়ে আসে। শুধু ভুট্টার দানার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে কৃষকরা সম্পূর্ণ ফসলটিকে উচ্চমানের সাইলেজে রূপান্তর করতে পারেন। এর ফলে বন্যা মৌসুমে গবাদিপশুর জন্য নিরবচ্ছিন্ন খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধানের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে অধিক অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। ফসল ও গবাদিপশুর সমন্বিত এই পদ্ধতিটি হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রাখবে।

চ্যালেঞ্জ

কৃষকদের সচেতনতার অভাব, সাইলেজ তৈরির যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, উন্নতমানের ভুট্টার বীজের ঘাটতি, সংরক্ষণের উপকরণের অভাব, ঋণপ্রাপ্তির সীমিত সুযোগ এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবার মানকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করেন গবেষক।

গবেষকরা মনে করেন, এটি কেবল একটি নতুন শস্য ও উৎপাদন পদ্ধতিই নয়, বরং বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ হাওর এলাকায় শস্য ও গবাদিপশু পালনকে সমন্বিত করার মতো একটি সম্ভাবনাময় জীবিকা কৌশল। সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত সহায়তার মাধ্যকে এই প্রযুক্তি দেশের বন্যাপ্রবণ জলাভূমি এলাকায় টেকসই কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।