গত ৯ জুলাই রাতে হঠাৎ হবিগঞ্জের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর তীররক্ষা বাঁধের ২শ ফুট অংশ ভেঙে যায়। এর ফলে নোয়াবাদ, চরহামুয়া, আদ্যপাশা, বনগাঁও, কালীগঞ্জ, সুঘর ও কটিয়াদিসহ প্রায় ৩০টি গ্রামে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়। তলিয়ে যায় শত শত হেক্টর আমন ধানের বীজতলা, শাকসবজির ক্ষেত। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে পড়েন ৩০ গ্রামের ৩১ হাজার মানুষ। তারা প্রায় ছয় দিন পানিবন্দি ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ইজারা না দেওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলেই বাঁধটি মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়ে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউপির সদস্য মো. সাহেব আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করে আসছিলাম। প্রশাসনকে জানানো সত্ত্বেও সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাঁধ ধসে পুরো এলাকা ভাসিয়ে দিল।’
হবিগঞ্জ জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, আইনের তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণেই বাঁধটি ভেঙেছে। বর্তমানে দুর্গত এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠী পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করেছেন।
ড্রেজার বা পাম্প দিয়ে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও শায়েস্তাগঞ্জের চরহামুয়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছিল ‘শামীম বিল্ডার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অনুসন্ধানে দেখা যায়, শামীম বিল্ডার্সের মালিক ইকবাল হোসেন আলাপুর মৌজার জে এল নং ১৫৬, খতিয়ান নং ১, দাগ নং ৮৯০ সীমানার মধ্যে বালু উত্তোলনের জন্য জেলা প্রশাসনের চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু চুক্তিনামা ভঙ্গ করে আরএস ৫৭৫ ও ৪০১ দাগের জমি কেটে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়।
এ ছাড়া ড্রেজারের পাইপ ঢোকানোর জন্য করা বাঁধের ছিদ্র অংশ দিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করে ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
বাঁধ ভাঙার পর প্রশাসনের ঘুম ভেঙেছে : স্থানীয় বাসিন্দারা অবৈধভাবে উত্তোলনের ফলে খোয়াই নদীর বাঁধ হুমকিতে থাকার কথা জানানোর পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন। গত ৯ জুলাই বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর মাঠে নামে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসন। ১১ জুলাই পাউবো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে। তখন অনিয়ম ও চুক্তি ভঙ্গের কারণে শামীম বিল্ডার্সের ড্রেজার মেশিন ও পাইপ জব্দ করা হয় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের আদেশ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সামিউল ইসলাম বাদী হয়ে গত ১৩ জুলাই শায়েস্তাগঞ্জ থানায় শামীম বিল্ডার্সের মালিক মো. ইকবাল হোসেন ও শায়েস্তাগঞ্জের সুদিয়াখলা গ্রামের মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। অভিযুক্ত ইকবাল ও মামুনূরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় বাসিন্দারা এই অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদের হয়রানি করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদার মো. ইকবাল হোসেন স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন হবিগঞ্জ সদর থানায়।
এই বিপর্যয়কে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতে নারাজ পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশ রক্ষা সংগঠন ধরিত্রীর জন্য আমরা (ধরা) হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক ও খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপারের সমন্বয়কারী তোফাজ্জল হোসেন সোহেল বলেন, ‘বালু উত্তোলনের কারণেই খোয়াই নদীর বাঁধে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। আইন প্রয়োগ না করার কারণেই সাধারণ মানুষকে আজ এই ভয়াবহ খেসারত দিতে হচ্ছে।’ সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনির্ভাসিটির ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল বলেন, ‘ড্রেজার ব্যবহার করে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন আইন ও পরিবেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তীররক্ষা বাঁধ টেকসই হবে না।’
আক্রান্ত কালীগঞ্জ গ্রামের কৃষক আবদুল করিমসহ স্থানীয় সাধারণ মানুষের দাবি কেবল মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা হোতাদের শাস্তি চায়। ঘরবাড়ি ও ফসল হারানো ৩১ হাজার মানুষের জন্য অবিলম্বে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও পুনর্বাসনসহ টেকসই তীররক্ষা বাঁধ পুনর্নির্মাণের দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, বালু উত্তোলন ও বাঁধ কেটে বালু পরিবহনের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধের ভাঙা অংশটি মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। এতে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় হবে।