২০২৪ সালের ২১ জুলাই দিনটি ছিল রবিবার, কারফিউর দ্বিতীয় দিন। শ্রাবণের মৃদু কালো মেঘ যেন সূর্যকে কিছুটা আড়াল করে দিয়েছিল। চারদিকে যেন নীরব আতঙ্ক বিরাজ করছিল। পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি একটু পরপর টহল দিচ্ছিল। সাধারণ মানুষের তেমন একটা উপস্থিতি ছিল না।
আমিসহ আমাদের ছাত্রদলের প্রায় ৭০-৮০ জনের একটি দল মিছিল নিয়ে বসুন্ধরা গেট অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব যৌথভাবে আমাদের লক্ষ্য করে অনবরত গুলি চালাতে শুরু করে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি এসে আমার পেটের ডান পাশে এবং ডান উরুতে লাগে। একপর্যায়ে টিয়ারগ্যাসের তীব্রতায় টিকতে না পেরে আমরা বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম।
সেদিন আমিসহ আমাদের তিনজন সহযোদ্ধা, একজন হকার এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে গলিপথ দিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর আমরা ইট-পাটকেল নিয়ে পুলিশের সঙ্গে প্রতিরোধ চালিয়ে যাই। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় বসুন্ধরা গেট ও আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
তাঁরা আমাদের দুই দিক থেকে আক্রমণ করছিল। দুই পাশ থেকে যখন গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাস ছোড়া হচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল— "আজই আমার জীবনের শেষ দিন।"
সেই সময় আমি যমুনা ফিউচার পার্কের পকেট গেটের অপর পাশে ছিলাম। আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটি ভিডিও রেকর্ড করি। সেখানে বলি, "এই আন্দোলনে যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে আমার লাশটা আমার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেবেন।"
সেদিন মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। কিছুটা ভয় পেলেও সংকল্প করেছিলাম— মরব, তবুও খুনি হাসিনার পতন ঘটিয়েই মরব। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ না দেখলেও পুলিশের হিংস্র মনোভাব এবং আমাদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা গুলি যখন শত্রুর মতো আমার দিকে ছোড়া হচ্ছিল, তখন মনে হয়েছিল আমরা যেন আরেকটি যুদ্ধ করছি।
আর সেই যুদ্ধের প্রতিপক্ষ যেন আমারই দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব এবং একটি ফ্যাসিবাদী সরকার। কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বাসায় ফিরি, কিন্তু আতঙ্ক ও ভয় পিছু ছাড়ছিল না।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় কারও সঙ্গে তেমন যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। কোথায় কী হচ্ছে, তারও কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না।
তৎকালীন সময়ে লন্ডনে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সফিকুল ইসলাম রিবলুর সঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে যোগাযোগ হতো। তিনি লন্ডন থেকেই আমাদের বিভিন্ন তথ্য ও দিকনির্দেশনা দিতেন। সেদিন তিনি ফোন করে বলেন, "তোমরা আর কয়েকটা দিন আন্দোলনটা চালিয়ে যাও। সরকার পতনের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। তোমরা যদি ব্যর্থ হও বা ভয় পাও, তাহলে তোমাদের সবাইকে একে একে জীবন দিতে হবে।"
২০১৩ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে সফিকুল ইসলাম রিবলুর বাম চোখ নষ্ট হয়ে যায়। পরে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেলে একাধিক মামলার কারণে তাঁর দেশে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি লন্ডন থেকেই জুলাই আন্দোলনের কর্মীদের তথ্য, পরামর্শ এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যখন ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো রাজপথে নেমে আসে, তখন আন্দোলন দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার তখন এই আন্দোলন দমনে মরিয়া হয়ে ওঠে। পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সোয়াট দিয়ে নিরীহ, নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো হয়। পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয় অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে। চিরচেনা পিচঢালা রাস্তা রক্তে লাল হয়ে যায়।
গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির সিনিয়র নেতাদের। মূলত ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামকে গুলি করে হত্যা করার পর আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সেদিনের পর আমি নিজেও মৃত্যুভয় হারিয়ে ফেলি। মনস্থির করি— হয় বাঁচব, নয়তো মরব; কিন্তু খুনি হাসিনার পতন ঘটিয়েই ছাড়ব।
বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। সেই এক দফা বাস্তবায়নে আমরা জীবন-মৃত্যুর সীমানা অতিক্রম করে বসুন্ধরা গেট অভিমুখে ছাত্রদলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলি। পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সেদিন আমাদের অনেক সহযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হন।
আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হলে ছাত্র-জনতার ওপর প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে গণহত্যা চালানো হয়। ১৮ জুলাই সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ২০ জুলাই থেকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করা হয়।
সেসময় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এল ব্লকের একটি বাসায় রাতযাপন করতাম। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ১০টার মধ্যে কয়েকজন করে প্রগতি সরণির মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান নিতাম। সন্ধ্যার আগেই রাজপথ ছেড়ে দিতাম। ইন্টারনেট বন্ধ ও কারফিউ জারি করে তৎকালীন সরকার আন্দোলনের টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছিল।
সেনাবাহিনীর টহল এবং পুলিশের গুলির মুখে অনেকেই ভয়ে বের হতেন না। কিন্তু আমরা আন্দোলন চালিয়ে গেছি। কারফিউর মধ্যেও ঝটিকা মিছিল করেছি। সেই দিনগুলো সহজ ছিল না। বসুন্ধরা গেট অভিমুখ নির্মম গণহত্যার এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।
আমাদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁরা পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। স্কুলজীবন থেকেই আমি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি।
তৎকালীন স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোই ছিল আমাদের একমাত্র স্বপ্ন। ধারাবাহিক আন্দোলনের একপর্যায়ে ২৩ জুলাই সরকার কোটা সংশোধনের প্রজ্ঞাপন জারি করলে অনেক আন্দোলনকারী নিজেকে গুটিয়ে নেন। আন্দোলন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ঝরে গেছে অনেক তাজা প্রাণ। মা হারিয়েছেন তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন।
কিন্তু আমরা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা রাজপথ ছাড়িনি। ২৬ জুলাই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ক— নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং আবু বাকের মজুমদারকে গ্রেপ্তার করা হলে আন্দোলনের বড় দায়িত্ব ছাত্রদলের কাঁধে এসে পড়ে।
তখন আমরা ছাত্র-জনতাকে একত্রিত করে আন্দোলনকে আরও চাঙা করে তুলি।
২৭ জুলাই বসুন্ধরা গেট অভিমুখে আমরা শক্ত অবস্থান নিই। দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে হঠাৎ র্যাবের একটি হেলিকপ্টার থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো শুরু হয়। আমি তখন প্রগতি সরণির মাঝখানে ছিলাম। হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও টিয়ারগ্যাস ছোড়া দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। মনে হচ্ছিল, রাস্তাটি যেন বিশাল মাঠের মতো প্রশস্ত হয়ে গেছে।
কোনোমতে দৌড়ে লন্ডন মার্কেটে ঢোকার চেষ্টা করি। মানুষের তীব্র চাপে সিঁড়িতে পড়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পাই।
একই দিনে ব্যাংক এশিয়া মোড়ে পুলিশের আবারও আক্রমণের শিকার হই। পুলিশ আমাকে বেধড়ক মারধর করে এবং কোমরে একাধিক লাথি মারে। এতে আমার কোমরের ৪ ও ৫ নম্বর ডিস্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আমি দমে যাইনি। আমার উপলব্ধি ছিল— আমার সহযোদ্ধারা যখন জীবন দিচ্ছেন, তখন আমি এখনো বেঁচে আছি।
আহত হওয়ার পর ডা. শাহ আমান উল্লাহ (বর্তমানে ড্যাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক) আমাকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেন। পরবর্তীতে বিএনপি পরিবারের সদস্যসচিব কৃষিবিদ মিথুন তালুকদার আমার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। আমি এখনো চিকিৎসাধীন।
হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথা যেন মৃত্যুযন্ত্রণাকেও হার মানায়। এর থেকে সাময়িক স্বস্তির জন্য এখন ফিজিওথেরাপিই আমার প্রধান ভরসা।
আমার পরিবার যখন জানতে পারে আমি আন্দোলনে যাচ্ছি এবং আহত হয়েছি, তখন তারা আমাকে বারণ করেছিলেন। কিন্তু আমি আন্দোলন চালিয়ে যাই।
সর্বশেষ ৫ আগস্টের সকালটি ছিল ভীষণ নাটকীয়। সকাল ১০টায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত গ্রামীণফোনের অফিসের সামনে জড়ো হয়ে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হতে চাইলে ভাটারা থানার পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি ও টিয়ারগ্যাস ছুড়তে থাকে। টানা দুই ঘণ্টা গুলি চালিয়ে আমাদের টপ টেন মোড় ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। পুলিশের গুলি শেষ হওয়ার পর আমরা পাল্টা ধাওয়া দিলে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়।
দুপুর ১২টার দিকে আমরা বসুন্ধরা গেটে পৌঁছালে সেনাবাহিনী সাঁজোয়া যান নিয়ে আসে। আমরা সেই সাঁজোয়া যানে উঠে তাঁদের সঙ্গে কোলাকুলি করি। এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা বলি, "গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, আমরা স্বাধীন হয়েছি।" সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, "আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। আর একটি গুলিও আপনাদের দিকে ছোড়া হবে না।"
পরে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারি, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, প্রায় দুই হাজার প্রাণহানি ও ২০ হাজারের বেশি আহত মানুষের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
সমন্বয়কদের সরকারের উপদেষ্টাদের লাগামহীন দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় জুলাইয়ের অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং আমাদের চরমভাবে আশাহত করেছে।
জুলাইয়ের স্পিরিট ধারণ ও সর্বোপরি প্রতিষ্ঠা করতে আমরা এখনো নীরব আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। গণতন্ত্রের আপসহীন ধারাবাহিকতা এবং জুলাইয়ের অর্জনকে প্রতিষ্ঠিত করতে এখনো রাজপথে সক্রিয় রয়েছি।
লেখক : জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নেতা