গুরুত্ব পাচ্ছে আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা

মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনে অভিজ্ঞতা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকারি দল। এর ধারাবাহিকতায় সংসদ সদস্যদের মতামত নিচ্ছেন সংসদের হুইপরা। এরপর মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটির খসড়া করে তা উপস্থাপন করা হচ্ছে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে। সংসদ নেতা হুইপদের সঙ্গে আলোচনা করে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি চূড়ান্ত করছেন।

অভিযোগ উঠেছে বেশিরভাগ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের এসব কমিটির সভাপতি করা হলে সংসদ আরও বেশি কার্যকর হতে পারত। অভিযোগ রয়েছে সংসদীয় কমিটি গঠন ধীরগতির। সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সংসদ বসার পর তিন অধিবেশনের মধ্যে সংসদীয় কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মধ্যেই কমিটি গঠনের কাজ শেষ হবে। বাকি কমিটিগুলো চূড়ান্ত প্রায়। আগামী অধিবেশনের শুরুতেই বাকি কমিটিগুলো গঠন করা হবে। 

কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সংসদের তিন অধিবেশনের মধ্যে ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও দুই অধিবেশনের পর গঠিত হয়েছে মাত্র ১৯টি কমিটি। এর মধ্যে ১০টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, ৯টি সংসদবিষয়ক। সংবিধান সংশোধনবিষয়ক কমিটিও রয়েছে। কমিটি গঠনে ধীরগতির বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকিতে স্থবিরতার শঙ্কা থাকছে। তবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ জানান, তৃতীয় অধিবেশনের শুরুতেই গঠন করা হবে বাকি কমিটি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশ শুরু হয় ১২ মার্চ। এরপর ৭ জুন শুরু হয় বাজেট অধিবেশন। শেষ হয় ১৫ জুলাই। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন সংসদ নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ ছিল বেশ। তবে দুটি অধিবেশনে আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন কতটা হলো সে প্রসঙ্গে সংসদের চিফ হুইপ বলেছেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে ত্রুটি রাখেনি সরকারি দল।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। আশঙ্কার তো কোনো শেষ নেই। জনগণ বিশ্বাস করে যে, আমরা তাদের কথা বলি, যে কারণে ফেসবুক, ইউটিউব অথবা ইনস্টাগ্রাম না চালিয়ে যখন পার্লামেন্ট চলে, মানুষ পার্লামেন্ট দেখে।

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী মন্ত্রণালয় ও সংসদ সম্পর্কিত মোট ৫০টি কমিটি গঠন করতে হবে। তিন অধিবেশনের মধ্যে এসব গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও দুই অধিবেশনে গঠিত হয়েছে মাত্র ১৯টি। সংসদ সচিবালয় থেকে সরবরাহ করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশনের দিন সংসদে কার্য উপদেষ্টা কমিটি, সংসদ কমিটি, বিশেষ কমিটি, বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটি গঠন করা হয়। ২ এপ্রিল গঠন করা হয় লাইব্রেরি কমিটি এবং ২৬ এপ্রিল গঠন করা বিশেষ কমিটি। দ্বিতীয় অধিবেশনে শুরুর পর ১০ জুন গঠন করা হয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও কার্য উপদেষ্টা কমিটি (পুনর্গঠন)। ১৪ জুন গঠন করা হয় অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। ১৩ জুলাই গঠন করা হয় সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়বিষয়ক স্থায়ী কমিটি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।  

মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের বিষয়ে সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিটি গঠনকে সামনে রেখে সংসদ সদস্যদের কাছে হুইপরা জানতে চেয়েছেন তারা কে কোন মন্ত্রণালয়ের কমিটিতে থাকতে চান। কেউ কেউ তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বাকিরা সংসদ নেতা ও হুইপদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। যাদের যে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা কিংবা আগ্রহ রয়েছে তাদের সে মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হবে বলে জানতে পেরেছি।’

এ বিষয়ে সরকারদলীয় এক হুইপ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনে অভিজ্ঞতা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় সংসদ সদস্যদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এরপর মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটির খসড়া করে তা উপস্থাপন করা হচ্ছে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে। সংসদ নেতা হুইপদের সঙ্গে আলোচনা করে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি চূড়ান্ত করা হচ্ছে।’

গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত আরও ছয়টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। নতুন কমিটিগুলো হলো মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। গঠিত সব কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে মনিরুল হক চৌধুরীকে। শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সংরক্ষিত আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরীকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুবকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনকে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে রাজশাহী-৩ আসনের বিএনপির এমপি মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলনকে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে মুশফিকুর রহমানকে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ড. আব্দুল মঈন খানকে। আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে। সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ তাহেরকে। মঈন খান বিগত বিএনপি সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন। মনিরুল হক চৌধুরীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাপতি করা হয়েছে। খালেদ হোসেন মাহবুব একজন ব্যবসায়ী, তাই তাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাপতি করা হয়েছে।  

সংসদের কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে এমন অভিযোগ এনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপিকা দিলারা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদে ৫০টি কমিটি গঠন করতে হবে। বলা যায়, সংসদ ধীরগতিতে চলছে। তা ছাড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত যে ১০টি কমিটি গঠন করা হয়েছে তাতে একজন ছাড়া বাকিগুলোতে সরকারদলীয় এমপিদের সভাপতি করা হয়েছে। বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদ যদি নিজের মতো করে চালাতে চায় তা ভালো হবে না। জুলাই আন্দোলন এ কারণে হয়নি। মানুষ গুণগত পরিবর্তন আশা করে। সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি পদ বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের দেওয়া উচিত। এতে মন্ত্রণালয়গুলোতে জবাবদিহি আসবে। অবশ্য সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব এই কমিটি যাচাই-বাছাই করতে পারবে।

কমিটি গঠনে ধীরগতির বিষয়ে সরকার দলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খুব দ্রুততার সঙ্গে কমিটি গঠন করা যায় না। তারপরও দুই অধিবেশনে আমরা ১০টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি করেছি। যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো আমরা করেছি। তৃতীয় অধিবেশনের শুরুতে বাকি কমিটি গঠনের কাজ শেষ হবে।’