জল-অরণ্যের ক্যানভাস

ভাটা নামলে দূর থেকে নিদ্রারচরকে মনে হয় কাদা আর বালিতে ঢাকা এক মৃত ভূখণ্ড। কিন্তু একটু কাছে গেলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। কাদার বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য শ্বাসমূলই উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের প্রাণ। জোয়ার এলে সবুজ ঘাসে মোড়া চরটি যেন নতুন জীবন ফিরে পায়। কেওড়া-গেওয়ার ছায়া, লাল কাঁকড়ার ছুটে চলা, দূরে জলরেখা সব মিলিয়ে বরগুনার তালতলীর সোনাকাটা ইউনিয়নের নিদ্রারচর যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক জল-অরণ্যের ক্যানভাস।

কিন্তু সেই নৈঃশব্দ ভেঙে এখন শোনা যাচ্ছে করাতের শব্দ। কোথাও কেওড়া গাছ কাটা হয়েছে, কোথাও মাটি কেটে তৈরি হয়েছে রাস্তা। আবার কোথাও ইট, বালু, সিমেন্ট আর রড দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। যে বন প্রকৃতির নিজস্ব প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে উপকূলকে আগলে রেখেছে, সেই বনই এখন মানুষের কর্মকাণ্ডে বিপণœ হয়ে উঠছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে নিদ্রারচরের প্রায় ১ হাজার একর এলাকা সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দুই দশক পর বন বিভাগের মূল্যায়ন, শুধুমাত্র সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা যথেষ্ট নয়। পুরো এলাকাকে এখন ‘বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের ২০ মে পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগ থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, নিদ্রারচরের ১৬ দশমিক ৬ একর এলাকা এমন একটি বিশেষ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল, যার মতো এলাকা বাংলাদেশে রয়েছে মাত্র একটি। অন্যটি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষায়, এখন আর শুধু বন রক্ষা নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বন বিভাগের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পর্যটকদের অবাধ চলাচল, মোটরসাইকেল প্রবেশ, প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত ভ্রমণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল। এই শ্বাসমূল দিয়েই গাছ অক্সিজেন গ্রহণ করে। অর্থাৎ মানুষ যখন শ্বাসমূলের ওপর হাঁটে বা যানবাহন চালায়, তখন কেবল গাছের শিকড়ই ভাঙে না ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে থাকে পুরো বন। বন বিভাগের মতে, পর্যটনের চাপ শুধু গাছের ক্ষতিই করছে না; বদলে দিচ্ছে চরটির স্বাভাবিক প্রকৃতিও।

পরিবেশকর্মী ও পর্যটন সংগঠক আরিফুর রহমান জানান, ২০২৪ সালের শেষ দিকে নিদ্রারচরে ঘুরে তিনি কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সৈকতটির সৌন্দর্য উঠে আসে। এরপর থেকেই দ্রুত বাড়তে থাকে পর্যটকের সংখ্যা। তিনি বলেন, ‘আজ মানুষ সেই বনের ফুসফুসের ওপর দিয়েই হাঁটছে। কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে ঢুকে পড়ছে কেওড়া বনের ভেতরে। অথচ ম্যানগ্রোভের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশই হচ্ছে এই শ্বাসমূল।’

আরিফুর রহমানের অভিযোগ, পর্যটকদের জন্য সরকারি উদ্যোগে বনের ভেতরে কংক্রিটের বেঞ্চ ও চলাচলের পথ নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল, যা সংরক্ষিত বন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাকিনা বন বিট কর্মকর্তা রাহিমুল ইসলাম জুমেল বলেন, ‘গত ২৬ এপ্রিল টহল দেওয়ার সময় বনকর্মীরা সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে কেওড়া গাছ কাটা, রাস্তা তৈরির জন্য মাটি খনন এবং স্থায়ী বেঞ্চ নির্মাণের প্রস্তুতি দেখতে পান। বনকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে সংশ্লিষ্টরা পালিয়ে যান।’ এই ঘটনা নিয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটকদের সুবিধার জন্য ওয়াশরুম, বেঞ্চ ও চলাচলের পথ তৈরির একটি পরিকল্পনা ছিল। তবে বনবিভাগের আপত্তির পর সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।’ তবে সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইউনুস ফরাজি ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তার ভাষ্য, টিআর প্রকল্পের আওতায় পর্যটকদের বসার জন্য পাঁচটি পাকা বেঞ্চ নির্মাণে ১ লাখ ৭ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। তিনি নিজের অর্থে কাজ শেষ করলেও এখনো বরাদ্দের বাকি অর্থ পাননি। তবে সংরক্ষিত বনে কীভাবে সরকারি প্রকল্প নিয়ে অর্থ ব্যয় করা হলো তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। 

পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া বলেন, ‘নিদ্রারচর কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এখানে রয়েছে বিরল প্রজাতির কচ্ছপ, কাঁকড়া, ঝিনুক, শামুক, বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ, সরীসৃপ এবং ম্যানগ্রোভনির্ভর অসংখ্য কীটপতঙ্গ। এ ছাড়া কেওড়া, গেওয়া, ছৈলা, খৈয়াবাবলা, হাড়গোজা, ঝাউ ও করমজাসহ বিভিন্ন উপকূলরক্ষী বৃক্ষ এই বনকে সমৃদ্ধ করেছে। এই বন সারা বছর প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য হিসেবে কাজ করে। জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার বিরুদ্ধে এটি প্রকৃতির নিজস্ব প্রতিরক্ষা দেয়াল।’

বনবিভাগ এখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর ২১ ধারা অনুযায়ী নিদ্রারচরকে ‘বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা’ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে।