আইসিটি মামলায় চার্জশিটভুক্তরা নির্বাচন করতে পারবে না

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চার্জশিটভুক্ত আসামিদের প্রার্থিতা অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দ্বৈত নাগরিকদেরও অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে কমিশনের ১২তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনে বড় পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন।

এ বিষয়ে সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, পাশাপাশি নির্বাচনী আচরণ বিধিমালাগুলো সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব পাঠাব, তারা উপযুক্ত মনে করলে ব্যবস্থা নেবেন। এ প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগে দ্রুতই পাঠানো হবে বলে জানান ইসি সচিব।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে বেলা ১১টায় সভা শুরু হয়ে দুপুর ২টায় এক ঘণ্টার মূলতবি করে বিকেল সাড়ে ৫টার পরে শেষ হয়। সভায় ২০০৯ সালে করা স্থানীয় সরকারের পাঁচটি আইন তথা সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ আইনের পর্যালোচনা করা হয়।

এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রতি ১৫ বছর পরে নবায়ন করার সুযোগ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। নবায়নের সময় আবেদনকারীকে ফি দিয়ে পরিবারের সদস্যদের তথ্য দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ইসি প্রত্যেক নাগরিকের ফ্যামিলি ট্রি বা বংশগত তথ্য তৈরি করতে পারে। ১৫ বছরের কম বয়সীদেরও এনআইডি প্রদানের পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। তবে এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়সসীমা পরে নির্ধারণ করা হবে।

বৈঠক শেষে আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, এই আইনগুলোর ভেতরে কমিশনের বিবেচনায় যেসব জায়গায় সংশোধন করা দরকার, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দিতে চায় না ইসি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার এবং দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার সুপারিশ করবে ইসি। সিটি নির্বাচনে প্রশাসকরা পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন না এবং সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতাও রাখা হচ্ছে ইসির প্রস্তাবে। এজন্য সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ আইন সংশোধনে সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে ইসি।

ঋণখেলাপিদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে দুটি ক্ষেত্র বন্ধকদাতা এবং জামিনদার। ব্যক্তিগতভাবে বন্ধকদাতা তিনি তো আছেনই, কিন্তু জামিনদারদের ঋণখেলাপি হিসেবে অযোগ্য করার একটা প্রস্তাবনায় আমরা নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছি। এর পাশাপাশি বিলখেলাপি। বিদ্যুৎ বিল, ভূমি কর, ওয়াসা এ ধরনের সেবা প্রদানকারী সংস্থায় যদি কোনো বিলখেলাপি থাকে, সেটা ব্যক্তিগত হতে পারে বা প্রাতিষ্ঠানিক হতে পারে। এটা অযোগ্যতা হিসেবে আসবে। লাভজনক পদে থেকে নির্বাচন করা যাবে না।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল কবে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিডিউল চূড়ান্ত হলে জানাব। আমরা কোনো টাইমলাইন দেইনি। প্রস্তুতির ব্যাপারটা চলমান। আমরা বলেছি ৩১ জুলাই পর্যন্ত যারা ভোটার নিবন্ধিত হবেন তাদের নিয়ে আমাদের কাজ। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেছিলেন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, তো সেই অনুযায়ী আমাদের ড্রাফট রেডি করে কাজ করতে হবে।’ আইন সংশোধনীর কারণে ভোট পেছানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা তো আমি বলতে পারব না। সংসদ অধিবেশন তো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে না। এক্ষেত্রে আমরা যত দ্রুত দিতে পারব (সুপারিশ), তত দ্রুত আরেকটা কাজ আগাতে পারব।’

আইন সংশোধনের কাজ তো স্থানীয় সরকার বিভাগের। সে দায়িত্ব ইসি কেন নিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, ‘ইসির সুপারিশ করা বা প্রস্তাবনা দেওয়ার এখতিয়ার আছে কি নেই? যদি বলেন প্রস্তাবনা দেওয়ার এখতিয়ার নেই, তাহলে একভাবে। আবার মনে করেন, পর্যালোচনা করার জন্য সুপারিশ। সুপারিশ যে রাখতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা মনে করেছি সুপারিশ করা যায়। সে জন্য সুপারিশ পাঠাব। রাখা বা না রাখা যার এখতিয়ার, তিনি করবেন।’

এতে সরকার চাপে পড়বে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ইসির সচিব বলেন, সরকার চাপে পড়বে কি না সেই সিদ্ধান্ত সরকার নেবে।

কমিশন সভায় এনআইডি সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে ভোটার স্থানান্তর নিয়ে কথা হয়েছে উল্লেখ করে আখতার আহমেদ বলেন, ভোটার এলাকা স্থানান্তরে অনলাইনে আবেদন করা যাবে। স্থানান্তরের একটা সংশোধনী ফি দিতে হবে, এটা নতুন করে নির্ধারণ করা হবে।

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে প্রতি ১৫ বছর পর এনআইডি নবায়নের কথা বলা হয়েছে। ইসি সচিব বলেন, এনআইডি নবায়নের জন্য নির্ধারিত একটা ফর্ম থাকবে। একটি ফ্যামিলি ট্রির কথা বলা হয়েছে। সেই ফর্মে আবেদনকারী বা এনআইডিধারী তার পরিবারের তথ্যটা দেবেন যাতে সঙ্গতিটা আমরা মেইনটেইন করতে পারি। এক্ষেত্রেও একটা ন্যূনতম ফির ব্যাপার আছে।

বর্তমানে অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সীদের এনআইডির জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়। যাতে ১৮ বছর হলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকাভুক্ত হয়ে যান। আখতার আহমেদ বলেন, এ তথ্য সংগ্রহের পর্যায়টা কোন পর্যন্ত নামানো যায়, সেটা নিয়ে আরও কিছু পর্যালোচনার পরে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বর্তমানে এনআইডির জন্ম তারিখ সংশোধন কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হয়। এ বিষয়ে কমিশন বিকল্প ভাবছে উল্লেখ করে সচিব বলেন, এখন পাবলিক পরীক্ষার সনদের (এসএসসি, জেএসসি ও পিএসসি) জন্ম তারিখের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে এই সংশোধনগুলো করতে পারবে। সেই ব্যবস্থা করা হবে।

প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধনের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধনের ব্যাপারে একটা টু-স্টেপ মেকানিজম ছিল। প্রবাসীরা ফর্ম জমা দেওয়ার পর বায়োমেট্রিক দেওয়ার পরে আমাদের এখানে তদন্তে আসত, তদন্ত পারফর্ম হওয়ার পরে সেটা আপলোড হতো। এখন বায়োমেট্রিকটা আপলোড করে দেবেন, আমরা এখানে তদন্তে যথার্থতা পেলে এখান থেকেই অনুমোদন  দিয়ে দেব। এতে একটা স্টেপ কমে যাবে।