যুদ্ধে যাচ্ছে ইয়েমেনের হুতিরা!

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত তেলসমৃদ্ধ পশ্চিম এশিয়াকে নতুন সমীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের আঁচ লেগেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশেই। এর পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সংঘাত এ যুদ্ধের পরিধি বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। গত সোমবার সৌদি আরবের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় সে সম্ভাবনা আরও প্রকট হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, লোহিত সাগরে হুতিদের নৌ-অবরোধ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ইরানের প্রভাব বাড়াবে। পাশাপাশি ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে ইতিমধ্যেই চরম সংকটে থাকা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে এই পদক্ষেপ আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে।

লোহিত সাগর উপকূলের উত্তরের প্রতিবেশী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিরা কীভাবে এই নৌ-অবরোধ কার্যকর করবে কিংবা এতে আবারও পণ্যবাহী জাহাজে হামলা শুরু হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অতীত বলে, হুতিদের সে সামর্থ্য রয়েছে। ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে হুতিরা ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজ ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। যার ফলে শিপিং কোম্পানিগুলোকে অনেক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল রুটে জাহাজ চলাচলে বাধ্য করে।

ইয়েমেন লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অবস্থিত। হরমুজ প্রণালি ইতিমধ্যেই ব্যাহত হওয়ায়, লোহিত সাগর ‘উপসাগরীয় তেল ও অন্যান্য জ্বালানি’ পণ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। এটি বন্ধ করে দেওয়া হলে তা জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রে নতুন একটি ফ্রন্ট উন্মুক্ত করবে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ করবে। ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলার পরই হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের শিয়া গোষ্ঠীগুলো রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়ে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিলেও, হুতিরা তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। তবে পরিস্থিতি আচমকাই মোড় নেয় যখন গত সপ্তাহে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দাবি করে, তারা ইরানের একটি বিমান অবতরণ ঠেকানোর জন্য সানা বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। হুতিরা এই হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে এবং এর জবাবে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় পার্বত্য অঞ্চলের আবহা বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। হুতিদের পলিট ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ ইরানের প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি এভাবে উত্তপ্ত হতে থাকলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে আংশিক অবরোধ আরোপ করে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলসহ অন্যান্য রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা জ্বালানির দাম বাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী এক বড় ধাক্কা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতে সৌদি আরব তাদের স্বাভাবিক দৈনিক অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৭০ শতাংশেরও বেশি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে সরিয়ে নেয়। ইয়ানবু থেকে ইউরোপগামী জাহাজগুলো সুয়েজ খালের মধ্য দিয়ে উত্তরে যায়। আর এশিয়ামুখী জাহাজগুলো বাব আল-মান্দেব হয়ে দক্ষিণে যায়। ‘কেপলার’ এবং ‘সিগন্যাল ওশান’-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়ানবু থেকে তেল পরিবহন দৈনিক গড়ে ৪০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল মাত্র ৯ লাখ ৭৩ হাজার ব্যারেল। কেপলারের তথ্যমতে, গত জুন মাসে বাব আল-মান্দেব দিয়ে দৈনিক ৭৪ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশ। গত বছর এই পরিমাণ ছিল দৈনিক ৪২ লাখ ব্যারেল।

হুতিরা নব্বইয়ের দশকে উত্তর ইয়েমেনে একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সানার তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা সৌদি সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ইরান হুতিদের তাদের আঞ্চলিক ‘অক্ষশক্তি’ বা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর অংশ হিসেবে মনে করে, যার মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোও রয়েছে।