গাজী নজরুলকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার

তরুণীর সঙ্গে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার জেরে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে দলটির সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে। নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বুধবার নির্বাহী পরিষদের বৈঠক ডাকে জামায়াতে ইসলামী। বিকালে ঢাকার মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ বৈঠক হয়। সেখানে এমপি গাজী নজরুলকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বহিষ্কার এবং একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তবে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দল থেকে বহিষ্কারের পর ওই দলের নেতা হিসেবে এমপি থাকার নৈতিকতা হারিয়েছেন গাজী নজরুল। নৈতিক স্খলনের বিষয়টি সংসদীয় কমিটিতে তদন্ত হতে পারে।

তাছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে।

এদিকে দল থেকে বহিষ্কৃত হলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। গতকাল তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মূল পরিচয় ও আইনগত ভিত্তি তৈরি হয় দলগত কাঠামোর ওপর ভর করে। তাই দল যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করে এবং তার মনোনয়ন প্রত্যাহার বা বাতিল করে, তবে তার আসন শূন্য হওয়াটাই স্বাভাবিক আইনগত প্রক্রিয়া।

অন্যদিকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি দিয়েছে জামায়াত। গত রাতে সংগঠনটির সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান গণমাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বাতিল করার জন্য ইসিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ধারা ১২(১) অনুযায়ী এবং সংবিধানের ৬৬ ধারা অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করার কথা বলা হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কার করার পরে তিনি আর দলীয় মনোনীত প্রার্থী নন। আবার স্বতন্ত্র প্রার্থীর যোগ্যতাও তার নেই। ফলে তিনি সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।

স্পিকারকে কোনো চিঠি দেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর আগে এ ধরনের দুটি ঘটনা ছিল। সেক্ষেত্রে সেই ব্যক্তিদের দল স্পিকারকে চিঠি দেওয়ার পরে তিনি সেই চিঠি নির্বাচন কমিশনকে পাঠিয়েছেন। আমরা যেহেতু সরাসরি ইসিতে চিঠি দিয়েছি, সেজন্য স্পিকারকে চিঠি দেওয়া হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা শিশির মোহাম্মদ মনির ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে তার ফেসবুকে লিখেন ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে ‘পদত্যাগ’। তিনি হয়েছেন ‘বহিষ্কার’। জামায়াত নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে। কারণ বলা হয়েছে ‘নৈতিক স্খলন’। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে না।’

গত সোমবার রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যায়। মঙ্গলবার দুপুরে গাজী নজরুল নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে জানান, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম বেগম। গত ১৭ জুন প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে ঢাকায় মরিয়াম বেগমের বাবা মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে বিয়ে সম্পন্ন হয়। এরপর তার প্রথম স্ত্রী, ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ এবং ‘দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা’ ভিডিও বক্তব্য দেন। তাদের বক্তব্যে গাজী নজরুলকে নির্দোষ দাবি করা হয়। তবে এতেও শেষ রক্ষা হলো না। দলীয় এমপিকে নিয়ে নানা সমালোচনার পর গতকাল নির্বাহী পরিষদের বৈঠক ডাকে জামায়াত। এতে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হয়।

সাংগঠনিক তদন্তে এমপি গাজী নজরুলের নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৬২নং ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘কারও সদস্য পদ বাতিল হলে সংগঠনে তিনি থেকে যাবেন, কাজ করতে পারবেন। আর বহিষ্কার মানে সংগঠন থেকেই বহিষ্কার।’

এমপির বিরুদ্ধে গাড়িচালকের হত্যাচেষ্টার মামলা : গতকাল এমপি গাজী নজরুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা করেছেন তার সাবেক গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান। পাশাপাশি তিনি নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও চিঠি লিখেছেন। তার অভিযোগ, এমপির ‘অনৈতিক সম্পর্কের’ প্রতিবাদ করায় এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে তাকে ‘মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা’ করেন আসামিরা। বাকি চার আসামি হলেন মাসুম বিল্লাহ, মোতাসসিম বিল্লাহ, আমিনুর রহমান ও রাকিবুল হাসান।

ডিবি পুলিশের পল্লবী জোনাল টিমের এসআই রাকিবুল হুদা জানান, মঙ্গলবার ওবায়দুর রহমানের পল্লবী থানায় করা মামলায় গাজী নজরুল ছাড়াও আরও চারজনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে আমিনুর রহমানকে মামলা হওয়ার পরপরই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দিন আমিনুরকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। সেই সঙ্গে তিনি এ মামলার তদন্ত করে আগামী ২৪ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেন।

মামলার বিবরণে বলা হয়, ওবায়দুর রহমান পল্লবীর কালশীতে ‘রোজগার্ডেন টাওয়ারে’ তার বোনের বাসায় থাকতেন এবং এমপি গাজী নজরুল ইসলামের গাড়ি চালাতেন। তার আত্মীয়তার সূত্রে নজরুল ইসলাম ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। একপর্যায়ে নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওবায়দুরের ভাগ্নির ‘অনৈতিক সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে। বিষয়টি টের পেয়ে ওবায়দুর তার পরিবারকে জানান এবং এমপিকে এ সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতে বলায় ক্ষিপ্ত হয়ে নজরুল ‘প্রাণনাশের হুমকি’ দেন।

সাতক্ষীরায় মিষ্টি বিতরণ, শাস্তি চান জামায়াত সমর্থকরাও : সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, ভিডিওকা-ের ঘটনায় এমপি গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের পর তার নিজ আসন শ্যামনগর সদরে মিষ্টি বিতরণ করেছে সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে, শুধু বহিষ্কার নয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন জামায়াতের সাধারণ সমর্থকরাও।

সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি জামায়াত একটি নৈতিক সংগঠন, সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ব্যাপারে কর্মীরা বিভ্রান্ত হবে না। এই ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে।

এদিকে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শস্তির দাবিতে শ্যামনগর বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়। গতকাল ‘শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজ’র ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তারা বলেন, গাজী নজরুল জাতীয় সংসদকেই অপমানিত করেছেন। তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। আমাদের ভোটে এমপি হয়ে প্রতারণা করেছেন তিনি। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।