ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’

লেখক, পরিচালক ও প্রযোজক রুবাইয়াত হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। আগামী ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর ইতালির ভেনিসে অনুষ্ঠিত উৎসবে চলচ্চিত্রটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হবে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হতে যাচ্ছে। 

১৯৩২ সালে যাত্রা শুরু করা ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্বের প্রাচীনতম চলচ্চিত্র উৎসব এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আসর। চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা, উদীয়মান ধারা ও নির্মাণের উদ্ভাবনী পদ্ধতি তুলে ধরার জন্য উৎসবটির অরিজোন্তি বিভাগ বিশেষভাবে পরিচিত। 

২০১০ সালে ইশতিয়াক জিকোর স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘৭২০ ডিগ্রিজ’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি বিভাগে নির্বাচিত হয়েছিল। এটি ছিল উৎসবে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছিল খনা টকিজ, যারা এবার ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর বাংলাদেশি সহ-প্রযোজক। 

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ একটি মনস্তাত্ত্বিক হরর চলচ্চিত্র। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘মেফেয়ার’ বিউটি পার্লারকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রটির গল্পে জাইনীন নামের এক তরুণী বিয়ের প্রস্তুতির জন্য পার্লারে আসে। প্রস্তুতি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্য, শরীর, বিশ্বাস, স্মৃতি ও ভয়কে ঘিরে এক অস্বস্তিকর ও রহস্যময় জগতে সে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। 

চলচ্চিত্রটির প্রধান চিত্রগ্রহণ শুরু হয় ২০২৫ সালের ৮ জুন এবং শেষ হয় ৮ জুলাই। মোট ২৬ দিনে শুটিং সম্পন্ন হয়। পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ হয়েছে ফ্রান্সের প্যারিস এবং পর্তুগালের লিসবনে। বর্তমানে রুবাইয়াত হোসেন প্যারিসে চলচ্চিত্রটির চূড়ান্ত শব্দ মিশ্রণের কাজ সম্পন্ন করছেন। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন চৌধুরী করিম। এছাড়া আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন  রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, আজমেরী হক বাঁধন, দামীর খান শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম ও মোহাম্মদ বারী। 

ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রটির প্রতিনিধিদলে থাকবেন পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন; অভিনয়শিল্পী জাইনীন চৌধুরী করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ কামাল, আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান। ফ্রান্সের ল্য ফিল্মস দেলাপে-মিদি ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর মূল প্রযোজক। সহ-প্রযোজনা করেছে পর্তুগালের মিদাশ ফিল্মেশ, বাংলাদেশের খনা টকিজ, নরওয়ের বারেন্টসফিল্ম এএস এবং জার্মানির ট্যান্ডেম প্রোডাকশন। চলচ্চিত্রটির আন্তর্জাতিক বিক্রয়ের দায়িত্বে রয়েছে ফিল্মস বুটিক। 

চলচ্চিত্রটি সহায়তা পেয়েছে কাউন্সিল অব ইউরোপের ইউরিমাজ; ফ্রান্সের সিএনসি বা সঁত্র নাসিওনাল দু সিনেমা এ দ্য লিমাজ আনিমে-এর এদ ও সিনেমা দু মন্দ; পর্তুগালের ইনস্টিটুতো দু সিনেমা এ দু অডিওভিজুয়াল; ইতালির ফোন্দাৎসিওনে প্রাদা ফিল্ম ফান্ড; নরওয়ের সোরফন্ড এবং জার্মানির ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ড থেকে। 

ফোন্দাৎসিওনে প্রাদা ফিল্ম ফান্ডের প্রথম আসরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জমা পড়া ১ হাজার ২০০টির বেশি প্রকল্পের মধ্য থেকে মাত্র ১৪টি চলচ্চিত্র সহায়তার জন্য নির্বাচিত হয়। নির্বাচিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে স্বর্ণপামজয়ী থাই নির্মাতা আপিচাতপং বীরাসেথাকুলের নতুন চলচ্চিত্রও রয়েছে। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্বাচিত ১৪টি চলচ্চিত্রের মধ্যে পোস্ট-প্রোডাকশন পর্যায়ে সহায়তা পাওয়া একমাত্র চলচ্চিত্র। 

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ইএভিই প্রডিউসার্স ওয়ার্কশপ, বার্লিনালে কো-প্রোডাকশন মার্কেট এবং লেজ আর্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস বিভাগে অংশ নিয়েছে। চলচ্চিত্রটির প্রযোজক ফ্রান্সের ফ্রঁসোয়া দার্তেমার, পর্তুগালের পেদ্রু বোরজেস, বাংলাদেশের রুবাইয়াত হোসেন ও আদনান ইমতিয়াজ আহমেদ, নরওয়ের ইংরিড লিল হটগুন এবং জার্মানির আনা কাচকো। নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মো. শরিফুল ইসলাম। 

এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত চারজন নারী বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত। রুবাইয়াত হোসেন শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, রিকিতা নন্দিনী শিমু এবং সুনেরাহ কামালও শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। চলচ্চিত্রটির নির্মাণে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। কম্পোজার ছাড়া চলচ্চিত্রটির সব বিভাগের প্রধানই নারী। 

পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন বলেন, একটি সিনেমা জন্ম নেয় বহু মানুষের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ত্যাগ, ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং ভালোবাসা থেকে। আমি আমাদের পুরো নির্মাণদল, অভিনয়শিল্পী, কলাকুশলী, সহ-প্রযোজক এবং সহযোগীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই। মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি। আমার বাবা-মার প্রতি আমার অসীম কৃতজ্ঞতা, যাঁদের ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা ও দোয়া আমাকে এই পথ চলার শক্তি দিয়েছে। অনেক বছরের শ্রম, ভালোবাসা এবং বিশ্বাস নিয়ে আমরা এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছি। সবার কাছে দোয়া চাই। আল্লাহ যেন আমাদের এই পরিশ্রম কবুল করেন এবং সামনে আরও সুন্দর পথ খুলে দেন।’ 

ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর বিশ্ব প্রিমিয়ার ও প্রদর্শনীর বিস্তারিত সময়সূচি পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।