উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টির প্রভাবে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তাপাড়ের ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া ও ভেন্ডাবাড়ি এলাকায় আবারও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পানি কমে যাওয়ার পর বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুর থেকে পুনরায় নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে নদীর প্রবল স্রোতে ডান তীরে ভাঙন দেখা দেওয়ায় ফসলি জমি ও বসতভিটা হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তিস্তা নদী এখন ‘বহুরূপী’। দিনের বিভিন্ন সময়ে পানির উচ্চতা পরিবর্তিত হচ্ছে। নদীর প্রবাহ ঘুরে ডান তীরে আঘাত হানায় ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। গত দুই দিনে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় অন্তত ৬০টি পরিবার তাদের বসতঘর সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী জানান, সরকারি ত্রাণ হিসেবে ১৩ মেট্রিক টন চাল ও ২০টি শুকনো খাবারের প্যাকেজ বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
তবে এলাকাবাসীর দাবি, ‘আমরা ত্রাণ চাই না। বন্যা ঠেকাও, ভাঙন ঠেকাও। আশ্বাস নয়, স্থায়ী সমাধান চাই।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ডালিয়া ডিভিশন সূত্রে জানা গেছে, উজানের ঢল ও বৃষ্টির কারণে তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি ওঠানামা করছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেল ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ০৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচে। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার।
একই দিন সকাল ৯টায় পানির সমতল ছিল ৫১ দশমিক ৯৪ মিটার (বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার নিচে) এবং বিকেল ৩টায় ছিল ৫২ দশমিক ০০ মিটার (বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে)। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।
এর আগে বুধবার (২২ জুলাই) ভোর ৬টায় পানি বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং সকাল ৯টা পর্যন্ত তা অপরিবর্তিত ছিল। পরে দুপুর, সন্ধ্যা ও রাতে ধীরে ধীরে পানির উচ্চতা কমে।
পাউবোর ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, উজানে বৃষ্টিপাতের কারণে গত দুই দিন ধরে তিস্তার পানি বাড়া-কমার মধ্যে রয়েছে। আমরা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া ও ভেন্ডাবাড়ি এলাকার ডান তীরে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে এবং ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় কাজ চলছে।
তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া ও ভেন্ডাবাড়ি এলাকার পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক বাড়ির ভেতরে হাঁটুসমান পানি উঠেছে। অনেকে ঘরবাড়ি ভেঙে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ আরও দুই শতাধিক পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ ছাড়া নদীভাঙনের কবলে পড়েছে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা, ফসলি জমি ও শতাধিক পরিবারের বসতভিটা। ইতোমধ্যে ৬০টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা আল-আমিন ইসলাম।
তিনি বলেন, এলাকার রাস্তা-ঘাট তলিয়ে গেছে। মানুষ রান্না করে খেতে পারছে না। গবাদিপশুর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
ছাতুনামা-কেল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা হবিবর রহমান বলেন, এলাকার পাঁচ থেকে সাত শতাধিক পরিবার পানিবন্দি। বুধবার রাত থেকেই খাদ্যসংকট শুরু হয়েছে। রান্না করার পরিবেশ নেই। তাই দ্রুত শুকনো খাবার প্রয়োজন।
ভেন্ডাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা শুকুর আলী বলেন, আমার ঘরে পানি উঠেছিল, এখন নেমে গেছে। তবে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি এখনও পানির নিচে। একটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ত্রাণ নয়, তিস্তার বন্যা ও নদীভাঙন রোধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নুর হোসেন বলেন, আমার নিজের বাড়িও পানিতে তলিয়ে গেছে। নদীভাঙনের কারণে ৬০টি পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। বুধবার রাতে পানি কমলেও বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে আবার বাড়তে শুরু করেছে।
ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৩ মেট্রিক টন চাল ও ২০টি শুকনো খাবারের প্যাকেজ পেয়েছি। সেগুলো ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তার ডান তীরে ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তারা কাজ করছে। পাশাপাশি বন্যাকবলিত মানুষের জন্য চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে।