তিস্তার ভাঙন, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে স্থানীয়রা

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০১:১৩ এএম

কয়েক দফা বন্যার পর এবার তিস্তার ডান তীর হঠাৎ সরে এসে শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা।

ভাঙনের আতঙ্কে বসতঘর নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ। অপরদিকে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘সাইক্লোন সেল্টার সেন্টার’ (মুজিব কিল্লা) এখন নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। তিস্তার ডান তীর সরে আসায় নদী আর আশ্রয়কেন্দ্রের মাঝের দূরত্ব এখন ৫০ ফুটেরও কম বলে জানান স্থানীয়রা।

বুধবার (২২ জুলাই) সরেজমিনে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের তিস্তাপাড়ের কেল্লাপাড়া, ছাতুনামা এবং খালিশা চাপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ছে নদীতীর। কোথাও নৌকায়, কোথাও শ্রমিকের সহায়তায় ঘরের টিন, কাঠ ও আসবাবপত্র খুলে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন বাসিন্দারা। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে গৃহস্থালির মালামাল নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করছেন।

স্থানীয়রা জানায়, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক ভাঙনে তিস্তা অনেকটাই চওড়া হয়েছে। এবার বর্ষায় নদী আরও ডান দিকে সরে এসে লোকালয়ের খুব কাছে চলে আসায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে কেল্লাপাড়া, ছাতুনামা, ফরেস্টের চর ও বাইশপুকুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন।

এদিকে বুধবার দুপুরে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের উপসহকারী প্রকৌশলী মাইদুল ইসলাম। তিনি জানান, তিস্তার ডান তীর সরে আসায় আকস্মিক এই ভাঙন শুরু হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ, গাছের গুঁড়ি ও কাঠ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের তিস্তা নদীর পানি পরিমাপ নুরুল ইসলাম জানান, বুধবার(২২ জুলাই) বিকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি কমে বিপৎসীমার(৫২.১৫) ১৭ সেন্টিমিটার(৫১.৯৮) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিন সকাল ৬টা ও ৯টায় বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার(৫২.১৪) এবং বেল ৩টায় ১২ সেন্টিমিটার(৫২.০৩) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।

পাউবোর সূত্র মতে, চলতি বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানি ছয় দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে চারবার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টার মধ্যেই নেমে আসে। কিন্তু পানি কমার পরও চরাঞ্চল, কৃষিজমি, বসতভিটা ও গ্রামীণ সড়কে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী ছিল।

সূত্র মতে, বছরের পর বছর নদীর তলদেশে পলি ও বালু জমে তিস্তা তার স্বাভাবিক গভীরতা হারিয়েছে। ফলে অল্প পানিতেই নদী উপচে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ থেকে উজানের পানি ও পলি একসঙ্গে নেমে আসাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাইশপুকুর গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, এখন সামান্য পানি বাড়লেই তিস্তা দুই তীর উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। আজ (বুধবার) পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে।

ছাতুনামা গ্রামের আল-আমিন বলেন, গত ১৩ জুলাইয়ের বন্যার পর থেকে পানি ওঠানামা করছে। বুধবার ভোরে নদী হঠাৎ ডান দিকে সরে এসে প্রচণ্ড ভাঙন শুরু করে। মানুষ ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছে। তীব্র স্রোতের কারণে নৌকা চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুর রহমান জানান, কয়েক দিন আগেও নদীর মূল স্রোত বসতি থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট দূরে ছিল। এখন তা মাত্র ৫০ ফুটের মধ্যে চলে এসেছে। ইতোমধ্যে অন্তত সাতটি পরিবার তাদের বসতঘর সরিয়ে নিয়েছে। আরও অনেক পরিবার ঘর ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুর হোসেন বলেন, দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রটিতে যাওয়ার কোনো সড়কই আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। এখন সেটি নিজেই নদীভাঙনের মুখে। নির্মাণের পর থেকে কোনো পরিবার সেখানে নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারেনি।

ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী জানান, ভাঙনের বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।

ডিমলা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম জানান, ২০২২ সালে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ছাতুনামায় পাঁচ বিঘা জমির ওপর ‘সাইক্লোন সেল্টার সেন্টার’ নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকালে কেন্দ্রটি নদী থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট দূরে ছিল। বর্তমানে নদী মাত্র ৫০ ফুটের মধ্যে চলে এসেছে। দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে কেন্দ্রটিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, তিস্তার ডান তীরে আকস্মিকভাবে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। আমরা জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিচ্ছি।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইমরানুজ্জামান বলেন, ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। 

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত