জুলাই আন্দোলনের মামলা

‘পলাতক’ আসামি গোপনে চাকরি করছেন চট্টগ্রামে

জুলাই আন্দোলনে সরকার পতনের পর আনন্দ মিছিলে হামলার অভিযোগে মামলা হয়েছে সার্ভেয়ার মো. আবু ইউছুপ ইফতেখার দিপুর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া আরেকটি ফৌজদারি মামলাও আছে তার নামে। এই দুই মামলায় সার্ভেয়ার দিপুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে। কিন্তু ফৌজদারি মামলার আসামি হয়েও গোপনে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় কাজ করছেন সার্ভেয়ার দিপু। তিনি কুমিল্লা সদর গোবিন্দপুর গ্রামের মো. মহিউদ্দিনের ছেলে। এ ছাড়া সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘনসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

দিপুর নামে প্রথম মামলা (নম্বর ১৬) হয় কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বরে, এজাহারে ৪৮ নম্বর আসামি। দ্বিতীয় মামলা (নম্বর ২২) হয় ২০২৫ সালের ৭ জুলাইয়ে, এজাহারে ১৬ নম্বর আসামি। এসব মামলায় তিনি জামিন নেননি বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার জিআরও উপরিদর্শক জিল্লুর রহমান।

এদিকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে তিন মাস আগে দিপুকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় বদলি করা হয়। সেখানে যোগদানের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের এলএ শাখা থেকে তিনি ছাড়পত্রও নেন। তবে ১০৭ দিনেও নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি দিপু। জানা যায়, ‘অসুস্থতার’ অজুহাত দেখিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলির আদেশ ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন দিপু। চট্টগ্রামের প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে তাতে সফলও হন। সম্প্রতি এক আদেশে তাকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়।

অভিযোগ আছে, দুই সপ্তাহ আগে সার্ভেয়ার দিপুকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হলেও অনেকটা প্রকাশ্যে তিনি দাপ্তরিক কাজ করে যাচ্ছেন আগের কর্মস্থল চট্টগ্রামের এলএ শাখায়। বদলির আদেশ কার্যকরের পরও কীভাবে তিনি আগের কর্মস্থলে কাজ করছেন এ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার সিনিয়র সহকারী কমিশনার মানস চন্দ্র দাস গত মঙ্গলবার বিকালে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়ের আদেশে গত ১৫ এপ্রিল সার্ভেয়ার দিপুকে অত্র শাখায় বদলি করা হলেও তিনি অদ্যাবধি যোগদান করেননি। তার বদলির আদেশ বাতিল হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই।’

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় যান এ প্রতিবেদক। সেখানে সার্ভেয়ার দিপু সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন তার একাধিক সহকর্মী। একজন সার্ভেয়ার ৩৫ নম্বর আলমিরার সামনের চেয়ার দেখিয়ে বলেন, ‘এই চেয়ারে বসেন দিপু। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি হয়েছেন। তারপরও তিনি এখানে দাপ্তরিক কাজ করে যাচ্ছেন। বেশিরভাগ সময় অফিসে আসেন বিকেলের দিকে।’ মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে সার্ভেয়ার দিপুর খোঁজ করতে দেখা যায় অজ্ঞাত এক যুবক ও নারীকে। এই প্রতিবেদক তাদের জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘দিপু ভাইয়ের সঙ্গে একটু আগে ফোনে কথা হয়েছে। তাকে খুঁজছি।’ এ সময় দিপুর ওই সহকর্মী বলেন, ‘১০ মিনিট আগেও দিপু ভাই তার চেয়ারে ছিলেন।’

তথ্যসূত্র জানায়, মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে চট্টগ্রাম পরিবেশ আদালতের পাশে ১৪৪ নম্বর কক্ষে কিছু ‘দালালের’ সঙ্গে বসেছিলেন দিপু। এর আগে গত সোমবারও এলএ অফিসে এসে ‘দাপ্তরিক’ কাজ সারেন তিনি। গত সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম আদালত এলাকার ট্রেজারি অফিসে গিয়ে একটি এলএ কেইসের (১৬ ও ১৭) বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত আবদুস সাত্তার, গোলাম রব্বানী ও মো. হানিফের নামে ১৬ কোটি টাকার পৃথক কয়েকটি চেক গ্রহণ ইস্যু করান দিপু। এর আগে গত শনিবার বিকেলে ছুটির দিনে সংশ্লিষ্টদের ক্ষতিপূরণের ফাইলগুলো এলএ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী কমিশনার আনিছুর রহমানের কাছ থেকে অনুমোদন করিয়ে নেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত সোমবার সার্ভেয়ার দিপুকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠালোও সাড়া দেননি। গত মঙ্গলবার বিকেল সোয়া তিনটার দিকে তার বক্তব্য নিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় এবং জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। এলএ শাখার অফিস সহকারী শাহ আলম জানান, দিপু সাহেবকে একটু আগে দেখেছি। এখন কোথায় আছে জানি না।’

জান যায়, বিভাগীয় কমিশনার অফিসে ন্যস্ত থেকে সার্ভেয়ার দিপু দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার না হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার গুরুত্বপূর্ণ নথি ও বালামপত্র নগরের শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন নিজ ভাড়া বাসায় নিয়ে গিয়ে ক্ষতিপূরণের পেমেন্টের রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এলএ শাখা ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও শত শত কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের একটি সংবেদনশীল শাখা। এখান থেকে বদলি হওয়ার পরও একজন কর্মকর্তা কীভাবে সেখানে সক্রিয় রয়েছেন তা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দিপু প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘সার্ভেয়ার দিপু আমার কার্যালয়ে ন্যস্ত থাকলে এলএ শাখায় কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। চাকরিবিধি লঙ্ঘন করলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ জানা গেছে, গত ১৫ এপিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় সিনিয়র সহকারী কমিশনার (রাজস্ব) গোলাম মুস্তাফা মুন্না স্বাক্ষরিত এক আদেশে চট্টগ্রাম এলএ শাখার সার্ভেয়ার দিপুসহ তিন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। অভিযোগ আছে, চট্টগ্রামের এলএ শাখায় বর্তমানে কর্মরত এক কর্মকর্তার সঙ্গে দিপুর সখ্য রয়েছে। তাকে যেখানেই বদলি করা হোক না কেন দিপু তদবির করে চলে আসেন চট্টগ্রামের এলএ শাখায়। চট্টগ্রামের দায়িত্বপালনকালে দিপুকে বড় বড় প্রকল্পের কাজ দেন ওই কর্মকর্তা।

দিপুর চাকরিবিধি লঙ্ঘন ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে সিনিয়র সহকারী কমিশনার আনিছুর রহমান খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সার্ভেয়ার দিপু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি হয়েছেন। চট্টগ্রামের এলএ শাখায় তার কাজ করার সুযোগ নেই। শনিবার আমার দপ্তরে এসে ফাইল অনুমোদনের খবরটি সঠিক নয়। এটা মিথ্যা।’ এছাড়া ফৌজদারি মামলার আসামি কীভাবে চাকরিতে বহাল আছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তার (দিপুর) নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন এলএ শাখার অন্যতম শীর্ষ এই কর্মকর্তা।