মানুষ ভুল করে। কখনো জেনে। কখনো না জেনে। কখনো প্রবৃত্তির টানে। কখনো শয়তানের প্ররোচনায়। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, ভুলের পরও মানুষের জন্য ফিরে আসার দরজা খোলা থাকে। সেই ফিরে আসার নাম তওবা।
তওবা মানে নতুন জীবনের সূচনা। হৃদয়ের নতুন জাগরণ। আত্মার পরিশুদ্ধি। চরিত্রের পরিবর্তন। আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর পথ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মুমিনদের উদ্দেশে বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, আন্তরিক তওবা। আশা করা যায়, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের পাপগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত।’ (সুরা তাহরিম ৮)
এই একটি আয়াতই জানিয়ে দেয়, আন্তরিক তওবা মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবন বদলে দিতে পারে।
তওবায়ে নাসুহা : সুরা তাহরিমে মহান আল্লাহ ‘তাওবাতান নাসুহা’ বা আন্তরিক তওবার নির্দেশ দিয়েছেন। মুফাসসিররা বলেন, এটা এমন তওবা, যেখানে বান্দা নিজের গুনাহের জন্য সত্যিকার অর্থে অনুতপ্ত হয়, সঙ্গে সঙ্গে সেই গুনাহ ছেড়ে দেয়, ভবিষ্যতে আর ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে এবং যদি মানুষের কোনো অধিকার নষ্ট করে থাকে, তবে তা ফিরিয়ে দেয় বা ক্ষমা চেয়ে নেয়।
এমন তওবা শুধু মুখের কয়েকটি শব্দ নয়। এটি অন্তরের জাগরণ। এটি আল্লাহর সামনে নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করা। এটি গুনাহের পথ ছেড়ে হেদায়েতের পথে ফিরে আসা।
সর্বদা তওবার দরজা খোলা : শয়তানের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো মানুষকে নিরাশ করে দেওয়া। সে মানুষকে বোঝায়, এত গুনাহ করার পর আর ক্ষমা পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ কোরআন ঠিক উল্টো শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা জুমার ৫৩)
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘দিনের বেলায় গুনাহকারীর তওবা কবুল করার জন্য আল্লাহ রাতে তার হাত প্রসারিত করেন এবং রাতের গুনাহকারীর তওবা কবুল করার জন্য দিনে তার হাত প্রসারিত করেন। এমনিভাবে চলতে থাকবে। যতদিন না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয়।’ (সহিহ মুসলিম ২৭৫৯)
হৃদয়ে তওবার পরিবর্তন : মানুষের জীবনে পরিবর্তন শুরু হয় হৃদয় থেকে। তওবাও ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়। যখন একজন মানুষ নিজের গুনাহের কথা মনে করে কাঁদে, নিজের ভুলের জন্য লজ্জিত হয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন তার হৃদয়ে নতুন আলো জ্বলে ওঠে।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন তার হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে। সে যদি তওবা করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসে, তবে সেই দাগ মুছে যায়।’ (জামে তিরমিজি ৩৩৩৪)
তওবা শুধু ইস্তিগফার নয় : অনেকেই মনে করেন, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বললেই তওবা হয়ে যায়। অথচ তওবা এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। প্রথমত, গুনাহের জন্য আন্তরিক অনুতাপ থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সঙ্গে সঙ্গে সেই গুনাহ ছেড়ে দিতে হবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে আর সেই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। আর যদি মানুষের কোনো হক নষ্ট করা হয়ে থাকে, তবে তা আদায় করতে হবে। এই চারটি বিষয় ছাড়া তওবা পূর্ণতা পায় না।
তওবায় চরিত্র বদলে যায় : সত্যিকারের তওবা মানুষের বাহ্যিক আচরণেও পরিবর্তন আনে। আগে যে ব্যক্তি মিথ্যা বলত, সে সত্যবাদী হয়ে ওঠে। আগে যে হারাম উপার্জনে অভ্যস্ত ছিল, সে হালাল রিজিকের সন্ধান করে। আগে যে নামাজে অলস ছিল, সে নামাজকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করে। আগে যার জিহ্বায় ছিল গিবত ও কটু কথা, সেখানে চলে আসে জিকির, কোরআন তেলাওয়াত ও সুন্দর কথা।
গুনাহ নেকিতে পরিবর্তিত হয় : মহান আল্লাহর অসীম দয়ার একটি বিস্ময়কর দিক হলো, আন্তরিক তওবার মাধ্যমে তিনি শুধু গুনাহ ক্ষমাই করেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই গুনাহগুলোকে নেকিতে পরিবর্তন করে দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তবে যারা তওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে ভালো কাজে পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ফুরকান ৭০)
আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন : ক্ষমা করা এক বিষয়। আর ভালোবাসা আরেক বিষয়। মহান আল্লাহ শুধু তওবাকারীদের ক্ষমা করেন না, তাদের ভালোবাসেনও। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা ২২২) একজন বান্দার জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে যে, সৃষ্টিকর্তা নিজেই তাকে ভালোবাসেন!
সাহাবিদের জীবনে তওবার দৃষ্টান্ত : তওবার কারণে যাদের জীবন বদলে গেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম সাহাবি কাব ইবনে মালেক, মুরারা ইবনে রবি এবং হেলাল ইবনে উমাইয়া (রা.)। তাবুক যুদ্ধে তারা বিনা কারণে অংশ নেননি। পরে নিজেদের ভুল স্বীকার করেছিলেন। দীর্ঘ পরীক্ষার পর আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন এবং কোরআনে তওবা কবুলের ঘোষণা নাজিল হয়। (সুরা তওবা ১১৮)
তওবার সামাজিক সুফল : একজন মানুষের পরিবর্তন কখনো তার একার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন বাবা তওবা করলে পরিবারের পরিবেশ বদলে যায়। একজন মা আল্লাহর পথে ফিরে এলে সন্তানদের জীবনেও তার প্রভাব পড়ে। একজন ব্যবসায়ী তওবা করলে তার লেনদেনে সততা আসে। একজন শিক্ষক তওবা করলে তার শিক্ষা আরও কল্যাণকর হয়। একজন শাসক তওবা করলে জনগণ ন্যায়বিচার পায়। এভাবেই একজন মানুষের পরিবর্তন ধীরে ধীরে পরিবার, সমাজ ও জাতির পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তওবা বিলম্বিত করা উচিত নয় : অনেক মানুষ মনে করে, বৃদ্ধ বয়সে তওবা করবে, এখন জীবন উপভোগ করা যাক। কিন্তু কেউ জানে না, মৃত্যু কখন আসবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ বান্দার তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করেন, যতক্ষণ তার প্রাণ কণ্ঠনালি পর্যন্ত না পৌঁছে।’ (জামে তিরমিজি ৩৫৩৭) তাই তওবার জন্য আগামীকাল নয়, আজই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
তওবাকারীদের জন্য সুসংবাদ : সুরা তাহরিমের অষ্টম আয়াতে মহান আল্লাহ তওবাকারীদের জন্য এক অপূর্ব দৃশ্য তুলে ধরেছেন। সেদিন মুমিনদের সামনে ও ডান পাশে তাদের নুর ছুটে চলবে। তারা দোয়া করবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের নুর পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’
এটি এমন এক সম্মান, যা দুনিয়ার কোনো সফলতার সঙ্গে তুলনীয় নয়। দুনিয়ায় যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আখেরাতে আল্লাহ তাকে অপমান করবেন না। বরং নুর, ক্ষমা ও জান্নাতের মাধ্যমে সম্মানিত করবেন।
তওবা মানুষের অতীত গুনাহ মুছে দেয়, বর্তমানের আমল শুদ্ধ করে এবং ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে। এটি হতাশাকে আশায়, গুনাহকে নেকিতে, অস্থিরতাকে প্রশান্তিতে এবং আল্লাহ থেকে দূরে থাকা মানুষকে তার সান্নিধ্যের পথে ফিরিয়ে আনে।
তাই কোনো গুনাহই যেন আমাদের নিরাশ না করে। কোনো ব্যর্থতাই যেন আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। আজই হতে পারে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার দিন। আজই হতে পারে মহান আল্লাহর দিকে ফিরে আসার শ্রেষ্ঠ সময়। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তওবা করে, মহান আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দেন না। বরং তার অশেষ রহমত দিয়ে তাকে এমন এক নতুন জীবন দান করেন, যার পরিণতি দুনিয়ায় প্রশান্তি এবং আখেরাতে চিরস্থায়ী জান্নাত। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে যথাযথভাবে তওবা করার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার