বিশ্ব চলচ্চিত্রে শিক্ষার্থী আন্দোলন

ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক আন্দোলনের সূচনা হয়েছে শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার কিংবা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সব ক্ষেত্রেই তরুণদের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে আলোচিত। সেই বাস্তবতাই বারবার উঠে এসেছে বিশ্ব সিনেমায়। ছাত্র আন্দোলনের আদর্শ, সংগ্রাম, স্বপ্ন, দ্বন্দ্ব ও আত্মত্যাগকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র। এর মধ্যে পাঁচটি সিনেমা আজও দর্শক, সমালোচক ও চলচ্চিত্র গবেষকদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। লিখেছেন তারেক আনন্দ

দ্য স্ট্রবেরি স্টেটমেন্ট

১৯৭০ সালে মুক্তি পায় স্টুয়ার্ট হ্যাগম্যান পরিচালিত দ্য স্ট্রবেরি স্টেটমেন্ট। এই চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে লেখক জেমস সাইমন কুনেনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে। এতে অভিনয় করেছেন ব্রুস ডেভিসন, কিম ডার্বি ও বাড কর্ট। ১৯৬৮ সালের কলাম্বিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবিটিতে দেখা যায়, রাজনীতিতে অনাগ্রহী এক শিক্ষার্থী কীভাবে ধীরে ধীরে আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি পুরস্কার জিতে নেয় সিনেমাটি এবং ছাত্র আন্দোলনভিত্তিক চলচ্চিত্রের ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

ইফ...

ছাত্র বিদ্রোহ নিয়ে আরেকটি কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ইফ...’ মুক্তি পায় ১৯৬৮ সালে। ব্রিটিশ নির্মাতা লিন্ডসে অ্যান্ডারসনের পরিচালনায় নির্মিত ছবিটিতে অভিনয় করেছেন ম্যালকম ম্যাকডাওয়েল, ডেভিড উড ও রিচার্ড ওয়ারউইক। একটি বোর্ডিং স্কুলের কঠোর কর্তৃত্ববাদী পরিবেশের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিদ্রোহকে প্রতীকী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে এতে। একই বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ সম্মান ‘পাম দ’অর’ অর্জন করে সিনেমাটি।

দ্য এডুকেটরস

২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জার্মান চলচ্চিত্র ‘দ্য এডুকেটরস’। পরিচালনা করেছেন হান্স ওয়েইনগার্টনার। এতে অভিনয় করেছেন ড্যানিয়েল ব্রুল, জুলিয়া ইয়েনশ ও স্টাইপ এরসেগ। তিন তরুণ সমাজের ধনী ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদে নেমে পড়ে। সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক আদর্শ এবং তরুণদের পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবধর্মীভাবে তুলে ধরায় সিনেমাটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।

দ্য বাডার মাইনহফ কমপ্লেক্স

২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য বাডার মাইনহফ কমপ্লেক্স’। পরিচালনা করেছেন উলি এডেল। মরিটজ ব্লাইবট্রয়, মার্টিনা গেডেক, ইয়োহানা ভোকালেক ও ব্রুনো গানৎস অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি পশ্চিম জার্মানির ষাট ও সত্তরের দশকের ছাত্র আন্দোলন এবং সেখান থেকে রেড আর্মি ফ্যাকশনের উত্থানের বাস্তব ইতিহাস তুলে ধরে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এবং তরুণদের চরমপন্থায় জড়িয়ে পড়ার জটিল বাস্তবতা এতে ফুটে উঠেছে। ছবিটি ২০০৯ সালে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল।

নো

‘নো’ সিনেমাটি মুক্তি পায় ২০১২ সালে। পাবলো লারাইন পরিচালিত এই চিলিয়ান চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন গায়েল গার্সিয়া বার্নাল, আলফ্রেদো কাস্ত্রো ও অ্যান্টোনিয়া জেগের্স। যদিও এটি সরাসরি ছাত্র আন্দোলনের গল্প নয়, তবে তরুণ কর্মী, নাগরিক সমাজ ও গণআন্দোলনের শক্তিকে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছে। স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোচের শাসনের অবসানে গণভোটের প্রচারণাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি ২০১৩ সালে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পায়।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, এসব সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব এবং সামাজিক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কয়েক দশক পেরিয়েও এসব সিনেমার আবেদন কমেনি। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব চলচ্চিত্র ইতিহাস, গণতন্ত্র এবং সচেতনতার অনন্য উপলব্ধি।