তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের ত্রুটি শনাক্ত করতে পারেনি বিশেষজ্ঞ দল। টার্মিনালটি কবে থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারবে, তাও কেউ জানে না। অর্ধেক আরএলএনজি সরবরাহ নিয়ে ভয়াবহ গ্যাস সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
গ্যাস না থাকায় রাজধানীর বাসাবাড়ির চুলা জ্বলছে না। সিএনজি স্টেশনের বাইরে লম্বা লাইন ধরেছে গ্যাসচালিত গাড়ি। সিএনজি স্টেশন মালিকরা বলছেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় তারা ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন। কোথাও কোথাও থমকে গেছে শিল্পের চাকা।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল)-এর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের ডিএমজি (প্রকৌশলী) মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন গতকাল শুক্রবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে জানান, বলার মতো এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও রোমানিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ এনেছে। তারা টার্মিনালটি পর্যবেক্ষণ করছেন। কিন্তু ত্রুটি এখনো শনাক্ত করতে পারেননি। ত্রুটি শনাক্তের পর তা ঠিক করতেও সময় প্রয়োজন হবে। সংগত কারণে নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, কখন সরবরাহ বৃদ্ধি করা যাবে।
গত বুধবার জ্বালানি বিভাগ সংবাদ সম্মেলন করে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালীর দুটি টার্মিনালের একটিতে কারিগরি ত্রুটির কথা জানায়। তখন আশা করা হয়, খুব দ্রুতই সমস্যার সমাধান হলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে টার্মিনালটিতে ত্রুটি দেখা দেয়। এ সময় টার্মিনালটি অগ্নিকাণ্ডে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংকট কাটিয়ে বুধবার ভোররাতে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরুর প্রত্যাশায় আরপিজিসিএলকে বার্তা দেয় এক্সিলারেট এনার্জি। কিন্তু টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য দেশে থাকা এক্সিলারেট এনার্জির প্রকৌশলীরা ব্যর্থ হলে বিশেষজ্ঞ ডেকে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার মিলিয়ে সেই বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে এসে মহেশখালীর টার্মিনালে পৌঁছেছেন। কিন্তু তারা এখনো ঠিক কী কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়েছে, তা খুঁজে বের করতে পারেননি বলে জানিয়েছে আরপিজিসিএল।
তবে পেট্রোবাংলা শুরু থেকেই এ ঘটনায় একেবারে চুপ রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সংস্থাটির উদ্যোগ সম্পর্কে তারা নিজেরাও কিছু জানায়নি। এমনকি বারবার চেষ্টা করেও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, দেশে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও এত দিন সরবরাহ করা হচ্ছিল গড়ে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে সাম্প্রতিক সংকটে সরবরাহ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক ঘাটতির মধ্যে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কমেছে। এতে করে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।
সংকট সামাল দিতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমানো হয়েছে গ্যাসের সংকট সামাল দিতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমানো হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে দেখা গেছে, গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমানো হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে দেশে গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৯৪১ মেগাওয়াট। সাধারণ সময়ে যত সংকটই থাকুক না কেন, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন থাকে প্রায় ৫ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াট।
সাধারণত কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের জন্য ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন বন্ধ রাখলে সাশ্রয় হওয়া সম্ভব ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ রাখার পরও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনো ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি রয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা হলে লোডশেডিং করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না। তখন গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুতেরও ঘাটতি তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সিএনজি স্টেশনে লম্বা লাইন : রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরলে চোখে পড়ে শুধু দীর্ঘ লাইন এবং ‘গ্যাস নেই’ লেখা ঝুলন্ত সাইনবোর্ড। দিন কিংবা রাত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাক্সিক্ষত গ্যাস মিলছে না সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারগুলোর। যেসব পাম্প চালু আছে, সেখানেও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে, সিএনজি ট্যাংক পূর্ণ হতে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে।
সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর জানান, তারা ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন। বেশির ভাগ জায়গায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও চাপ এত কমে গেছে যে, একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে অনেক সময় লাগছে। এতে করে প্রতিটি সিএনজি স্টেশনের বাইরে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য শনিবার তাদের পেট্রোবাংলায় ডাকা হয়েছে।
রাজধানীর হাজীপাড়া সিএনজি স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ নামের একজন চালক জানান, তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিন্তু এখনো গ্যাস পাননি।
বাসা-বাড়িতেও সংকট : রাজধানীর এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে গ্যাসের চুলা ঠিকঠাক জ¦লছে। রান্নার প্রয়োজনীয় গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ পরিবারকেই বিকল্প উপায়ে খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে, না হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকে মৃদু আঁচেই রান্নার কাজ সারছেন।
রাজধানীর বনশ্রী ডি ব্লকের বাসিন্দা ডলি নাহার বলেন, এমনিতেই গ্যাস থাকে না। এরপর গত কয়েক দিন ধরে আরও সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, আগে রাতে গ্যাস পাওয়া যেত, কিন্তু এখন কোনো সময়ই পাওয়া যাচ্ছে না।
শিল্পের চাকা ঘুরছে না
গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চল-ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহে গ্যাসের চাপ অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, রাসায়নিক এবং অন্য গ্যাসনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারছে না। শিল্প খাতের এই সংকট শুধু উদ্যোক্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।