রিয়েল এস্টেটের নতুন ভবিষ্যৎ

দুই দশকে ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ সবকিছুকে ডিজিটাল করা হয়েছে। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সম্পত্তি বা ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়। এই সিদ্ধান্ত বলতে গেলে মূলত এলোমেলো, অস্বচ্ছ ও আস্থাহীন একটি বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে। এই অগোছালো পরিবেশ থেকে জন্ম হয়েছে স্বপ্নের প্রকল্প চঙজচ. ঢাকা ও চট্টগ্রাম, দেশের সবচেয়ে বড় ও মূল্যবান রিয়েল এস্টেট বাজারের যাত্রা শুরুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। রিয়েল এস্টেট বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য এর গভীরে গিয়ে পরিচালনা করাই  প্রধান লক্ষ্য।

কৃত্রিম বুদ্ধিমাত্তা (AI) কেন প্রয়োজন এবং ঝুঁকিপূর্ণ? : অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বিষয় নিশ্চিত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রিয়েল এস্টেটে বিপ্লব আনতে পারে, কিন্তু শুধু প্রযুক্তিতে আস্থা তৈরি হতে পারে না। বরং উল্টো ফল হতে পারে। PROP-এর পরিকল্পনায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ AI-নিয়ন্ত্রিত ব্যাপার রয়েছে : ১. মূল্য নির্ধারণ মডেল, যা এলাকাভেদে অনিয়ন্ত্রিত অপরিকল্পিত দামের বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাকে একটি যৌক্তিক বেঞ্চমার্ক দেবে।  ২. ম্যাচিং ইঞ্জিন, যা ক্রেতার চাহিদার সঙ্গে সঠিক প্রপার্টি অতি দ্রুত মিলিয়ে দেবে। কিন্তু এখানেই গবেষণার মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। একজন সাধারণ ক্রেতা, যিনি জীবনে প্রথমবার কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ফ্ল্যাট বা ল্যান্ড খুঁজছেন এবং একই সময়ে একজন পরিচিত ব্রোকার বা মিডলম্যান মুখে ভিন্ন দাম বলছেন, তিনি কেন একটি ‘ব্ল্যাক বক্স এআই’ সংখ্যা বিশ্বাস করবেন? এ প্রশ্নের উত্তর প্রযুক্তিতে নেই, আছে ‘হিউম্যান-এআই ইন্টারঅ্যাকশনের (HAI Interaction) নকশায়। বিশ্ববাজারের উন্নত অবস্থানের দিকে তাকালে দেখা যায়- যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, এমনকি পাশের দেশ ভারতের বাজারের মতো তুলনামূলক ব্যবসা সফল ডিজিটাল বাজারের জন্য এক্সপ্লেইনেবল এআই মডেলগুলো ধরে নেয় যে, ব্যবহারকারীর প্ল্যাটফর্মের প্রতি আস্থা আগে থেকেই আছে। শুধু প্রপার্টির বিস্তারিত জানালেই চলবে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন, এখানে প্ল্যাটফর্মের প্রতি আস্থা আনা মূল লক্ষ্য, তারপর সিদ্ধান্তের ধাপ।

আস্থা যেখানে পণ্য : PROP-এর মূল পরিকল্পনায় এআইকে ‘উত্তর দেওয়ার যন্ত্র’ হিসেবে নয়, বরং ‘ব্যাখ্যা করার সহযোগী’ হিসেবে দেখতে চেয়েছি। প্রতিটি মূল্য নির্ধারণের সঙ্গে দেখানো হবে, কোন Reference Property-এর ভিত্তিতে দামটি নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো গোপনীয়তা থাকলে, তা লুকানো হবে না।  বরং স্পষ্টভাবে জানানো হবে ডেটা কতটা সীমিত। একজন নতুন ব্যবহারকারী পাবেন সহজ, এক লাইনের ব্যাখ্যা; আর একজন অভিজ্ঞ মধ্যবর্তী ব্যক্তি বা এজেন্সি চাইলে পুরো বাস্তবতার চিত্র বিস্তারিত দেখতে পারবেন। এমনকি মধ্যবর্তী ব্যক্তি ও ক্রেতার জন্য ব্যাখ্যার ধরন আলাদা। কারণ একটি মার্কেটপ্লেসকে একই সঙ্গে দুই ধরনের ব্যবহারকারীর আস্থা অর্জন করতে হয়। এই যুক্তির পেছনে, একটি বাস্তব শিক্ষা কাজ করেছে। ভারতের সবচেয়ে বড় প্রপার্টি পোর্টাল ম্যাজিকব্রিকসকে MagicBricks) reference Case study হিসেবে নিয়েছিলাম। তাদের সাফল্য যেমন অনুকরণযোগ্য, তেমনি একটি দুর্বলতা শিক্ষণীয়। একই লিড একাধিক এজেন্টের কাছে বিক্রি করার প্রবণতা, তাদের নিজস্ব ব্রোকার সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। এক্ষেত্রে, PROP শুরু থেকে এই ভুল এড়াতে চায়। প্রতিটি লিড স্পষ্টভাবে ‘শেয়ারড’ নাকি ‘এক্সক্লুসিভ’ তা জানিয়ে দেওয়া হবে, যাতে মধ্যবর্তী ব্যক্তি (Broker) বা এজেন্সি নিজেদের ব্যবসায়িক হিসাব স্বচ্ছভাবে করতে পারেন।

ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক মডেল : PROP শুধু একটি প্রপার্টি লিস্টিং অ্যাপ নয়, এটি একটি নতুন ধরনের ব্যবসায়িক মডেলের ধারণা। যেখানে প্রযুক্তি, আস্থা এবং বাস্তবতা একসঙ্গে কাজ করে। দেশে নগরায়ণের গতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাড়ছে। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি ছাড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান বলছে, প্রযুক্তিগত ব্যবহার সমস্যা নয়; সমস্যা হলো আস্থা ও বিষয়বস্তুর মান। যে প্ল্যাটফর্ম এই সমস্যা প্রথম পূরণ করবে, সেই রিয়েল এস্টেট খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। দীর্ঘমেয়াদে PROP-কে  এমন এক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখি, যা শুধু ক্রেতা-বিক্রেতাকে সংযুক্ত করবে না, বরং মধ্যবর্তী ব্যক্তি (Broker), এজেন্সি ও ডেভেলপারদের জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করবে। পাশাপাশি একটি গ্রাহকবান্ধব সিআরএম সিস্টেম, যা দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে উঠবে। ধীরে ধীরে PROP-এর নিজস্ব মূল্য সূচক (Price Index) একটি নির্ভরযোগ্য বাজার তথ্যভান্ডার (Data Bank) হিসেবে ব্যাংক, ডেভেলপার ও বিনিয়োগকারীদের কাছে ব্যবহৃত হতে পারে। ঠিক যেভাবে আধুনিক মার্কেটপ্লেসগুলোতে ডেটা নিজেই মূল্যবান পণ্যে পরিণত হয়।

একজন Marketeer এবং Brand Practitioner  হিসেবে PROP নিজস্ব পরিকল্পনার ফসল হলেও, সচেতনভাবে এটিকে এখনো ‘প্রস্তাবিত নকশা’ বলছি চূড়ান্ত সমাধান নয়। দেশে এখনো কোনো প্রকৃত ব্যবহারকারী, এ সিস্টেমের মুখোমুখি হননি। বাস্তব ডেটা তৈরি হয়নি। এর পরবর্তী ধাপ ধারণাগুলো একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তব ব্যবহারকারীর কাছে পরীক্ষা, তাদের প্রতিক্রিয়া পরিমাপ এবং দেখা যে প্রস্তাবিত যুক্তি, ব্যাখ্যা এবং কাঠামো সত্যি আস্থা তৈরি করে কী না?  PROP শুধু ডিজিটাল প্রপার্টি প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি বিশ্বাসের প্রতিফলন। যেখানে প্রযুক্তি ও মানুষের বোঝাপড়ার মিশ্রণ এক হলে, রিয়েল এস্টেট খাতকে সম্পূর্ণভাবে নতুনরূপে গড়ে তোলা সম্ভব। এআই এখানে মানুষের জায়গা দখল করবে না।  বরং মানুষ ও প্রযুক্তির মধ্যে যে আস্থার সেতু এতদিন অনুপস্থিত ছিল, সেটি তৈরি হবে।

লেখক : হেড অব ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন অ্যান্ড এআই মার্কেটিং এপিক প্রপার্টিজ লিমিটিড

m.salahuddin0201@gmail.com