বালাইনাশকের ব্যবহার

নিয়মের বালাই নিশ্চিত করতে হবে 

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০১:০৯ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী এবং পরিবেশ আন্দোলনের অগ্রদূত  র‌্যাচেল কারসন তার  যুগান্তকারী ‘সাইলেন্ট  স্প্রিং’ গ্রন্থে রাসায়নিক বালাইনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি কঠিন সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। কারণ এগুলো অন্ধের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এর অভ্যন্তরীণ জটিলতা বিবেচনা না করেই তৈরি ও প্রয়োগ করা হচ্ছে।’ অথচ আমাদের দেশে মানহীন ও নিষিদ্ধ বালাইনাশকের কারণে বহুমাত্রিক ক্ষতি এবং ঝুঁকির মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। ‘লাভের গুড়’ খাওয়ার আশায় নানা কসরত করে বিদেশ থেকে নিম্নমানের বালাইনাশক আমদানি করছেন অনেক ব্যবসায়ী। অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানির পর দেশে প্রক্রিয়াজাত করে বিপণন করা বালাইনাশকের মানও নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। আবার নকল কীটনাশক তৈরি করে তা সারা দেশে ছড়িয়েও দিচ্ছে আরেকটি চক্র। অর্থাৎ বালাইনাশকের নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিষ্ঠায় নেই ফলপ্রসূ উদ্যোগ!

২৫ জুলাই দেশ রূপান্তরে এরই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ব্রাজিলসহ বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে ‘প্যারাকোয়াট’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।” অথচ দেশে এর ব্যবহার চলছে অবাধে! বিষয়টি নিশ্চয় উৎকণ্ঠার। শুধু ‘প্যারাকোয়াট’ই  নয়, দেশে নিষিদ্ধ উচ্চঝুঁকির ১৭টি বালাইনাশকের ব্যবহার চলছে এবং এর পরিণাম ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাতে শুধু পরিবেশই দূষিত হচ্ছে না, জনস্বাস্থ্যও নিপতিত  বিপজ্জনক পর্যায়ে। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (পিটাক) ৯০তম বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১৯টি বালাইনাশক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে আরও ১৭টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশকের ব্যবহার থেমে নেই। সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, বিপজ্জনক বালাইনাশকগুলোর তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাজার থেকে প্রত্যাহারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে কখন কীভাবে এ কাজ করা হবে তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

আমাদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল এই আত্মঘাতী প্রবণতা সম্পর্কে অবগত থাকার পরও শুধু নিষিদ্ধ করেই কি দায়িত্ব শেষ করার অবকাশ আছে? আরও প্রশ্ন হচ্ছে ‘কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’ এমন সিদ্ধান্ত এত বিলম্বে কেন? একই সঙ্গে বিস্ময়ের যে, এ নিয়ে কখন কীভাবে কাজ করা হবে তা-ই যদি নির্দিষ্টই করা না গেল তাহলে এই ‘কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ ত্রয়ী শব্দের মানেই-বা কী দাঁড়াল? পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যর জন্য চরম ক্ষতিকর বিষয় নিয়েও এই যে ‘হবে’, ‘হচ্ছে’র জটাজাল তা ছিন্ন করার দায় কার? মানবস্বাস্থ্য ও আবাদযোগ্য জমির উর্বরতার জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ করে ২০১৬ সালে কিছু বালাইনাশক নিষিদ্ধের আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের সরকার তা নিষিদ্ধও করে। কিন্তু কার্যকর নজরদারি না থাকায় এখনো সারা দেশে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে বিপজ্জনক বালাইনাশক। চলছে মানবদেহ বিষাক্রান্ত হওয়ার উপকরণের দেদার বাণিজ্য!

৯০তম পিটাক সভায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ অভিমত ব্যক্ত করেন, ‘আমদানি করা বালাইনাশক দেশে ঢোকার আগে বন্দরে গুণগত মান পরীক্ষা এবং এতে কোনো ভেজাল বা ক্ষতিকারক ভারী ধাতুর সংমিশ্রণ আছে কি না তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।’ কিন্তু  কৃষি বিভাগ বলছে, এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপযোগী ল্যাবরেটরি বা অবকাঠামো এখনো তৈরি করা হয়নি! আমরা মনে করি, সরকারের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে এর প্রতিবিধান নিশ্চিত করা। এ নিয়ে উদাসীনতা কিংবা সময়ক্ষেপণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়াতে হবে। আমরা যেন আমলে রাখি খ্যাতিমান পরিবেশবিদ ও ভূ-বিজ্ঞানী ও ক্যাথলিক ধর্মযাজক থমাস বেরির সেই সতর্কবার্তা। তিনি বলেছেন, ‘আমরা পাহাড় ভেঙে ফেলতে পারি, নদী শুকিয়ে উপত্যকা ভাসিয়ে দিতে পারি এবং মাটির মধ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ক্ষেতে বালাইনাশক ঢালতে পারি, যতক্ষণ না মাটি সম্পূর্ণ মৃত হয়ে বাতাসে উড়ে যায়।’ এমনটি তো কাম্য হতে পারে না।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত